Showing posts with label কলকাতার কড়চা. Show all posts
Showing posts with label কলকাতার কড়চা. Show all posts

Monday, April 10, 2023

একটু ভাজাভুজি, একটু অনিয়ম 😋


কলকাতার অনেক কিসিমে’র নাম আছে। সে কল্লোলিনী তিলোত্তমা থেকে শুরু করে নেহরুর বলা মিছিলনগরী... ইতিহাসের কিছুই এর না-দেখা নয়। কিন্তু আমি বলি আমার শহর খাদ্যনগরী। হ্যাঁ, হেন জায়গা নেই যেখানকার খাদ্যসম্ভার এখানে অমিল, আর কিছু কিছু ব্যাপারে তো কলকাতার জুড়ি মেলা ভার। আমি চিরকালই খেতে ভালোবাসি আর এই ভাজাভুজির দিকে ঝোঁকটা বেশিই। নোনতা স্বাদই জিভে ঠেকেছে, কি আর করা! কদিন ধরেই তাই ভাবছিলাম উত্তর কলকাতার দুয়েকটা নামজাদা ঐতিহ্যবাহী স্থান দর্শন করে আসার। সে আর হয়ে ওঠেনা, কিন্তু আজ মওকা পেয়ে দলবেঁধে গেলাম আস্বাদন গ্রহণ করতে। আজ আমাদের দল বেশ ভারীই ছিলো। আমি, Debanjan, Koushiki দি, ChiranJoy, Arijit Ghosh দা, Sudipta দা, Jayee দি.. সঙ্গে Snehasish এবং Anwesha অফিসফেরত সোজা যোগ দিলো। সঙ্গে পেয়ে গেলাম পথে যেতে যেতে Pial আর Roy বাবুকে, দুপুরে বলেছিলো হয়তোবা চলে আসতেও পারে!! তা যা ভাবা সেইমতন সবাইকে বলে দিয়েছিলাম নিরঞ্জন আগারের সামনেই সাক্ষাৎ করতে। 

আমাদের এতজনের জন্য তো আর চেয়ার-টেবিল খালি রেখে বসে থাকবেন না তাঁরা, অগত্যা বেশ খানিকটা অপেক্ষা করে বসার সুযোগ পেলাম বটে, কিন্তু বিধি বাম! ১৯২২ এ স্থাপিত এই বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় বিষ্যুদবার সেখানকার সিগনেচার আইটেম ডিমের ডেভিল হয়না!! কি করা যায়? কুছ পরোয়া নহী, বলা হলো ফাউল কাটলেট আনতে। সত্যিই দুর্দান্ত খেতে, মুচমুচে এবং সুস্বাদু। তারপর দোনোমোনো করে ডিমের চপ অর্ডার দিলাম, কিন্তু না!! ওটি ভালো লাগেনি একেবারেই, বেসনের আস্তরণে ডিম ঠিক জমলো না। একদিন অন্য বারে এসে ডেভিল গ্রহণ করতে হবে ভেবে দ্বিতীয় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। এইবার আমরা যাবো অ্যালেন কিচেন। 

১৯২৫ এর অ্যালেন কিচেনেও খানিকটা সময় অপেক্ষা করার পরে জায়গা পেলাম, কারণ একসঙ্গে এতজনকে স্থান সঙ্কুলান করাটাও মুশকিল কিনা! খুব বেশিক্ষণ নয় অবশ্য, অর্ডার দেওয়া হয়েছিল এখানকার বিখ্যাত পদ চিংড়ির কাটলেট। উলস্!! ঘিয়ে ভাজা চিংড়ির এই কাটলেট স্রেফ চমৎকার বললেও বিবরণ দেওয়া যায়না মশাই, গিয়ে খেয়ে আসতে হবে। যাক, ডিমের চপের দুঃখ অচিরেই ভুলতে পারছিলাম বৈকি। ততক্ষণে আবার টিপটিপ দুফোঁটা গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যা-ই হোক, দুয়েক ঢোঁক ঠাণ্ডা পানীয়ে চুমুক দিয়ে এইবার আজকের তৃতীয় তথা শেষ গন্তব্য, মণি রেস্তোরাঁ।

পটলার কচুরির অদূরেই এই ছোট্ট আস্তানাটি আজকের অভাবনীয় হিরো/হিরোইন/সেন্ট্রাল ক্যারেক্টর। এমন সুস্বাদু মাছের কচুরি, তাও মাত্র ১০/-(দশ) টাকায়, সত্যি বলছি ভাবতেই পারিনি। বলরাম বাবুর নাম, কারিগরী মাধুর্য আমি শুনেই ছিলাম সুদীপ্ত দার কাছে, আজ একেবারে হৃদয়ে পশিয়া গেলো। ফাউল কাটলেট যদি হয় শেহওয়াগের ভয়ডরহীন ব্যাটিং, ডিমের চপ একেবারে সদাগোপান রমেশ। চিংড়ির কাটলেট ধ্রুপদী রাহুল দ্রাবিড় আর মণি রেস্তোরাঁর মাছের কচুরি? আমার মতে আনসাং হিরো ভিভিএস লক্ষ্মণ। তারপর অবশ্য মিষ্টিমুখের পালা, বড়ো ভালো কাঁচা আমের স্বাদের সন্দেশ টুকটুক করে খান দুয়েক পেটে পুরে মধুরেণসমাপয়েৎ হলো। আজ এতজন একসাথে মিলে হইহই করে সন্ধ্যাটা বড়ো সুন্দর কাটলো। 

আবার একদিন হবে, শীতের সন্ধ্যায়। ফেরার পথে এইসব আলোচনা করতে করতেই দক্ষিণের বৃষ্টি গায়ে মেখে বাড়িতে। এ এক দারুণ আনন্দের ব্যাপার বটে। 😍

Friday, September 30, 2022

অথ কচুরি কাহিনী


ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারার পরে প্রাতঃরাশ, এই দিয়েই দিনের শুরু হয়, আর ইংরেজিতে একটা প্রবাদই আছে morning shows the day. আজকাল তো এই জলখাবারের নানান ধরণ এসেছে, সারা বিশ্বের খাদ্যাখাদ্য ডাইনিং টেবিলে শোভা পায়। তার উপর রয়েছে ডায়েটিংয়ের বাঁশি। তা সে যা-ই হোক না কেন, ভোরবেলার ঝলমলে রোদ আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে যায় কি দেখে? আরকিছুই নয়, কড়াইয়ে ঘি অথবা ডালডায় ভাজা সোনালী লালচে গোলাকার বস্তু দেখে; যার নাম কচুরি।

অরিজিৎ ঘোষ দার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিলো সকালবেলায় বিভিন্ন জায়গায়, তা সে উত্তর হোক বা দক্ষিণ কলকাতায়, কচুরি খাবে। একাজে সেকাজে সেটা কিছুদিন পিছিয়ে গেলেও মাথায় ছিলো বৈকি৷ কিন্তু, আমাদের জীবনের আরেকটি অঙ্গ তো আলস্য, সেটা ঠেকিয়ে এতো সকালে ছুটোছুটি করাও তো কঠিন। তাই, প্রায় চার মাস পরে আজ আমরা ক'জন বেরিয়ে পড়েছিলাম এই শুভকাজ সম্পন্ন করতে। রায় বাবু সামান্য অসুস্থ থাকায় যোগ দিতে পারেনি। তাই, আমাদের দেবাঞ্জন, সুদীপ্ত সাহা দা, অরিজিৎ ঘোষ দা আর এই অধম বেরিয়ে পড়লাম কচুরি অভিযানে। 

শুরুটা করলাম হরিশ মুখার্জি রোডের বিখ্যাত বলবন্ত সিংয়ের ধাবায়। অতিপরিচিত এই খাদ্যালয়ে হিংয়ের কচুরি আর আলুর তরকারি, কাঁচালঙ্কার আচার সহযোগে, কার না ভালো লাগে? এক প্লেটে চারটি গরমাগরম কচুরি, তারপর ভাঁড়ে গরম চা, মেজাজ খুশ হয়ে গেলো যাকে বলে! কিন্তু, সাথে আরেকটি কথাও আলোচনা করে নিলাম যে এরপরে তো আরো দুয়েকটা জায়গায় যেতে হবে, তাই ভাগযোগ করে খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর ট্যাক্সি ছুটলো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের আদি হরিদাস মোদকের দিকে। এটিও সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত পরিচিত বটে। প্রায় ২৫০ বছর ধরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এই স্থানের ব্যতিক্রমী চেহারা হলো পরিবেশনের ধরণে, কলাপাতায়। সেখানে পাওয়া গেলো কচুরি, এবং ছোলার ডালের তরকারি। বেশ সুস্বাদু, চটজলদি জায়গা পাওয়া যায়না সেটাই স্বাভাবিক। এখানে মোটামুটি খান তিনেক কচুরি গলাধঃকরণ করে ধীরেসুস্থে জলপানের পরে একটি সিগারেট ধরালাম।  

HaridasModak, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

উত্তর কলকাতায় এসে একটু গঙ্গা দর্শন না করলে কি হয়? তাই, পদব্রজে টুকটুক করে এগোলাম বাগবাজার মায়ের ঘাটের দিকে। সেখানে গঙ্গা পাড়ে বসে খানিকক্ষণ হাওয়া খেয়ে যাবো পটলার কচুরির পানে। পটলার কচুরি...... বাগবাজার গিয়েছেন অথচ এখানে ঢুঁ মারেননি এরকম লোক কে জানে আছে কিনা! ৯৩ নট আউট, স্টেডি ফুটস্টেপ, এবং অসাধারণ লাইন ধরে ড্রাইভ করে চলেছে। আহা, শীতকালের দোরগোড়ায় এসে একটু ক্রিকেটের উপমা দেওয়াই যায়, কি বলেন? এখানে কচুরির সাথে তরকারির স্বাদে আরেকটু প্রচলিত ধরনের ছোঁয়া পেলাম। ততক্ষণে পেট বেশ ভরেছে, এবং মন তো অবশ্যই। 

PotlarKochuri, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

কিন্তু, সব ভালো যার শেষ, তাই না? তা এদিকে এসে পুঁটিরাম হবেনা? না না, আমরা তেমনটা ঠিক নই। অতএব, করলে স্কোয়ারে অল্পসময় জিরিয়ে নিয়ে শেষ আখড়া কলেজ স্ট্রিটের পুঁটিরাম। সেখানে অবশ্য আরেকটু যোগ হলো কচুরির সঙ্গে টকদই, আর রসমালাই। আমাদের সুদীপ্ত দার একটু মিষ্টিমুখ না করলে কেমন খালিখালি লাগে কিনা! 

PutiramSweets, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

মন ভালো লাগে, চারপাশ কেমন যেন বদলে যায় সুখাদ্য গ্রহণের পরে। অতএব, এদিকের পাট চুকিয়ে আমরা গেলাম ধর্মতলায়। মশাই, ৪০/- টাকায় সেই লস্যি, উফফ!! খোয়াক্ষীর, কাজু, কিশমিশ, চেরি দিয়ে সুসজ্জিত। এটা এক গ্লাস খেলেই তো পেট ভরে যায়! 

Lassi, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর, বিদায় নেওয়ার পালা, কিন্তু আজ প্রাতঃরাশের জন্যে এই ছোট্ট সফর মনে থাকবে, অনেকদিন পরে সকালে ঘোরাঘুরি হলো, আর আমাদের খাদ্যসফরও আরেকটি ভোরেই শুরু হয়েছিল। পরেরবার অবশ্যই অন্যরকম আনন্দময় এক অধ্যায় নিয়ে আসবো এই-ই আশা। আপাতত, পুজো সব্বার ভালো কাটুক। ☺️

Saturday, August 27, 2022

মেট্রো চরিত


মেট্রো রেল কলকাতার অন্যতম গর্ব। ব্যস্ত অফিস্টাইমে যানজটহীন সওয়ারি হিসেবে মেট্রোর বিকল্প বোধহয় খুব কমই আছে। সেই ১৯৮৪তে পথ চলা শুরু করার পর থেকেই "পাতাল রেল" (তৎকালীন) খানিকটা "বোরোলিনের" মতোই (বঙ্গ জীবনের অঙ্গ) কলকাতা জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে পরিসর বেড়েছে মেট্রো রেলের। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানুষের ভিড়। আজকাল অফিস টাইমে খানিকটা লোকাল ট্রেনের মতোই গুঁতোগুঁতি ধাক্কাধাক্কি হওয়াটা জলভাত ব্যাপার হয়ে গেছে মেট্রো যাত্রীদের কাছে। তবে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়... তাই এটুকু সমস্যা মেনে নেওয়াই যায় আরকি!

রোজ কতশত মানুষ মেট্রোতে নিজের গন্তব্যে পাড়ি দেন। একটু লক্ষ্য করলেই এইসব মানুষের মধ্যেই প্রচুর মজার উপাদান পেয়ে যেতে পারেন! চলুন... আজ বরঞ্চ এইরকমই কিছু মানুষকে নিয়ে হালকা মজার আলোচনা করা যাক! 😀

১. দৌড়বিদ - প্রথমেই এঁদের কথা না বললেই নয়! এঁদের সবসময় খুব তাড়া! ধরুন প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে... এস্কেলেটরে জম্পেশ ভিড়... সবাই আগত ট্রেনটি ধরবে.... এমন সময় এই দৌড়বিদরা হটাৎ জেগে ওঠেন! পাক্কা প্রফেশনাল ফুটবলারদের মতো সামনের ভিড় খানিক গুঁতিয়ে, খানিক ডজ্ করে এঁরা মেট্রো ধরতে অগ্রসর হন! তবে পাশের সিঁড়ি খালি থাকলেও এঁরা নিজেদের "স্কিল" ভুলেও সিঁড়িতে দেখান না... ওখানে বড্ড খাটুনি যে! 😁 

এছাড়াও বাড়ি ফেরার সময়তেও এঁদের তাড়া দেখবার মতো! মেট্রোর গেট থেকে প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই যেভাবে দৌড় শুরু করেন তাতে উসেইন বোল্ট লজ্জায় পড়ে যাবেন! যেন গেট থেকে আগে বের হলেই মেট্রো কর্তৃপক্ষ পুরস্কৃত করবেন! 😆

২. নট সো সিনিয়র সিটিজেন - যাঁরা মেট্রোতে যাতায়াত করেন তাঁরা সবাই সিনিয়র সিটিজেন সিট সম্বন্ধে অবগত। এই বিশেষ সিট খালি থাকলে কম বেশী সবাই বসে যাই এখানে। আবার বয়স্ক কেউ উঠলে বেশিরভাগ লোকজনই সিট ছেড়ে দেন। কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায় আছেন যাঁরা সিট ছাড়তে অপরাগ! কোনও বয়স্ক যাত্রী এঁদের সিট ছেড়ে দিতে বললে এমন ভাবে তাকান যেন সিট নয় কিডনি চেয়ে ফেলেছে! 😆 অনেকেই আবার তক্ষুনি প্রচণ্ড ঘুমিয়ে পড়েন! এক দুবার ডাকলেও উঠতে চান না। অবশ্য সহযাত্রীদের হস্তক্ষেপে শেষমেষ সিট ছাড়তে বাধ্য হন।

৩. মরাল পুলিশ - এঁদের আবার সমাজের অবক্ষয় নিয়ে দারুণ চিন্তা! বিশেষত ট্রেনে কোনও প্রেমিক যুগল উঠলেই এঁরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন! তাঁদের সময় কি ছিল আর বর্তমানে সমাজের কি হাল এটাই মূলত এঁদের আলোচনার বিষয়! এমনিতে আলোচনা অবধি ঠিক আছে কিন্তু কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লে গোল বাঁধে তখন! 🙁

৪. ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায় - অফিস টাইমে আজকাল ভিড় ব্যাপারটা জলভাত হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এত ভিড় হয়ে যায় যে ঠিকমতো দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়ে। হালকা ধাক্কাধাক্কি চলতেই থাকে যার বেশিরভাগটাই অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা ওই যাকে বলে "ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়"! এঁরা অনেকটা মোবাইলের টাচ স্ক্রিনের মত! অল্প টাচ লাগলো কি দপ করে জ্বলে উঠল! নিজেরাও যে ভিড়ের মধ্যে অন্যকে ধাক্কা দিচ্ছেন সেই ধারণা অবশ্য এঁদের মগজে ঢোকানো দুষ্কর! 😆

৫. বই পোকা - এঁরা একটু ধির স্থির প্রকৃতির। চুপ চাপ মেট্রোয় উঠে একটা অপেক্ষাকৃত খালি জায়গা খুঁজে প্রথমেই দাঁড়িয়ে পড়েন। বসার জায়গা মিললে তো কথাই নেই! একটু পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে ব্যাগ থেকে বই বের করে সোজা তার মধ্যেই ডুবে যান। তারপর দুনিয়া গোল্লায় যাক... বই পড়ায় প্রভাব পরে না! শুধু মাঝে মাঝে মুখ উঠিয়ে দেখে নেন গন্তব্য এসে গেল কিনা। ও হ্যাঁ... আমিও নিজেও কিন্তু এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত! 😆

এছাড়াও আরো কত ধরণের মানুষ দেখতে পাবেন। কেউ খালি সিট দেখেও বসতে চান না। সহযাত্রীরা খালি সিট দেখিয়ে দিলেও সামান্য হেসে অথবা মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেন তিনি দাঁড়িয়েই খুশি! কেউ আবার আপাতদৃষ্টিতে ভর্তি সিটের মধ্যেও বসার জায়গা খুঁজে নেন! সিটের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমত "হেড" কাউন্ট করে বসার জায়গা বের করে নেন! কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করেন তো কেউ নিত্য দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও খেলাধুলো, অফিসের চাপ এইসব নিয়ে আলোচনা বাকবিতণ্ডা তো লেগেই থাকে। আসলে... আমরা সবাই... হয়ত নিজেদের অজান্তেই এইসব চরিত্রগুলির অংশ হয়ে যাই। তাই এই লেখাটি কাউকে ছোট করার জন্য নয়। শুধুমাত্র রোজকার ব্যস্ত জীবনযাত্রার মাঝে মজার কিছু মুহূর্ত তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই লেখা। আশাকরি ভাল লাগবে। 😀

Saturday, August 20, 2022

"খাদ্য সফরের দিশি কাহিনী"

#যারা_বৃষ্টিতে_ভিজেছিলাম, তারা ফুড ট্যুরটাও করেছিলাম। 

আষাঢ় শ্রাবণ পেরিয়ে ঋতুচক্র ভাদ্রে পা দিয়েছে, শহরটাকে সঙ্গে নিয়ে দিব্যি খেলছে কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদের মধ্যে। ঘর্মাক্ত হচ্ছি, আর দিনে দশবার করে বিরক্ত হচ্ছি, কখনো ভিজে, কখনো বা চাঁদি তাতিয়ে। সে যাকগে, অমন তো কতোই হয়!! তাই বলে কাজকর্ম করবো না? এ কি মানা যায় অ্যাঁ? না না, কাজ বলতে এদিকসেদিক পেটপুজো, বুঝলেন না? 

চীনে, পার্শী, আরবি, মুঘলাই ইত্যাদি ইত্যাদি হওয়ার পরে বন্ধু দেবাঞ্জন অনেকদিন ধরেই বলছিলো একবার আমাদের কলকাতার নিজস্ব ব্যাপার পাইস হোটেলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে! আমি মোটামুটি লেক মার্কেটের তরুণ নিকেতন বা নিউ মার্কেটে সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম, বা কলেজ স্ট্রিটের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলের তল্লাটে ঢুঁ মারলেও ও কখনো এই পরিবেশে খায়নি। তাই আমরা ক'জন ঠিক করেছিলাম একবার চিরপরিচিত বইপাড়ায় ঘুরে আসবো, আর একবার নাহয় ডানহাতের ব্যাপারটাও সেরে নেওয়া যাবে। অতঃপর, কথাবার্তা, আলোচনা, সময়, এবং দেখাসাক্ষাৎ করার স্থান নির্বাচন করে বেরিয়ে পড়লাম খাদ্য সফরের এই পর্যায়ে, যা কিনা অচিরেই বদলে যাবে বাঙালি থেকে মিশ্রিত চেহারায়। আহা, আনপ্রেডিক্টেবল না হলে জীবন কেমন বিশ্রী চায়ের মতো ঠেকে না?

আমি আর দেবাঞ্জন আসার পথে ঠিক করলাম প্রথমেই কি আর পাইস হোটেলে যাওয়াটা ভালো দেখাবে? মানে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের সময় না গিয়ে অবেলায়.. একবার অতি প্রিয় "গুঞ্জন" যেখানে হাতছানি দেয়, সেখানে যাবোনা? না না, এতটাও কঠিনহৃদয় নইকো। বাকিদের সেরকমই বলে দেবো স্থির করে গেলাম আমরা কলেজ স্কোয়ারের পথ ধরে ভিজতে ভিজতে। হ্যাঁ হ্যাঁ, অমন বৃষ্টি ঢের ঢের দেখেছি, ভয় দেখিয়ে লাভ নেই!! ছোট্ট, কিন্তু মনোরম, এই হলো সংক্ষেপে গুঞ্জন, আমরা এক এক করে জড়ো হলাম। খাদ্যরসিক হওয়ার একটা প্রাথমিক নিয়ম আছে, তা হলো মনের জানালা দরজা খুলে রাখা! হুম, তা-ই এলো নিজের ছন্দে মন ভালো করা রোস্টেড চিলি পর্ক, চিলি চিকেন, এবং চিলি প্রণ। সবই ড্রাই, কারণ মুখোরোচক পদ যা কিনা খাদ্যের সূচনা করবে, বেশি রসসিক্ত না হওয়াই ভালো, মনের এবং উদরের রসেই জারিত করা যাবে খন। প্রতিটি পদ সুন্দর, সহজ, এবং সুস্বাদু। পর্কের লীন মীট আর ফ্যাট সুষমভাবে বন্টিত, স্রেফ লঙ্কা ক্যাপসিকাম, এবং পেঁয়াজের সান্নিধ্যে পরিচিত মাংস, চিংড়ি সবারই পছন্দ হলো। বেশ ঠান্ডা হাওয়ায় ততক্ষণে চারদিক ভালোই লাগছে। 

Gunjancollegestreet, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove

Gunjancollegestreet, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove

আজ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে কলেজ স্ট্রিটের ৭২.৩৪% দোকান বন্ধ। তারই মধ্যে বইচই, বইবন্ধুর মতো কিছু জায়গায় ভালো কিছু সন্ধান পেলাম। নাহ্, নিইনি, পরেরবারের জন্য রেখে এইচি। ধূমপান, চা পান ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে এক চক্কর গেলাম কলেজ স্কোয়ারের গন্ডিতে। ঘড়ির কাঁটা তখন তলব করেছে মাথাকে, ওহে!! এবার চলো। সদলবলে উপস্থিত হলাম ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এই পাইস হোটেল সাক্ষী একমেবাদ্বিতীয়ম সুভাষ বসুর আগমনের, যার হাতে গড়া সেই মনগোবিন্দ পন্ডার সৃষ্টি আজ কালক্রমে মহীরুহে পরিণত। যা-ই হোক, দুপুরবেলা, ছুটির দিন হলেই ভিড় যথেষ্ট। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে সবারই স্থান সঙ্কুলান হলো বটে। আমরা একে একে নিজেদের পছন্দের পদ বললাম। কেউ খাসির মাংস, কেউ বা ইলিশ, আবার জাভেদ খেলো পারশে। সাথে ঘন মুগের ডাল, পুঁইশাকের চচ্চড়ি, আর আমের চাটনি, পাঁপড়। সহজ, এবং সুস্বাদু। বিশেষত চচ্চড়িতে ঠোঁট থেকে জিভ ছুঁতেই টপ করে এক বিন্দু অশ্রুজল নিঃসৃত হলো, সুখানুভব আরকি...! তরিবত করে ডানহাতের ব্যাপার সমাপন করে এলাম মোড়ে, মিঠেপান না হলে মধুরেণসমাপয়েৎ কেন বলেছে মশাই?? 

SwadhinBharatHinduHotel, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove



তারপর? বাড়ি ফিরে যাওয়া? আরে রোসুন, এতো তাড়া কিসের? একপাক নাহয় ঘুরেই যাই ধরমতল্লার মুলুকে। দুটো ট্যাক্সি, সাঁইসাঁই করে সোজা জিপিও ক্যাফে!! আমাদের জেনারেল পোস্ট আপিসের এই ব্যাপারটা শুনেছিলাম বন্ধু সপ্তর্ষির কাছে। মতলবটা ছিলো একদিন আসা যাবে, তা আজই কেন নয়? গেলুম, কিন্তু সত্যি বলতে কি, খাদ্যপানীয়াদি বড়োই অপ্রতুল... পরিবেশ চমৎকার বটে, ডাকটিকিট ও অ্যান্টিক সামগ্রীর আর্টিফ্যাক্ট দেওয়াল সুসজ্জিত করেছে, আর Ionic–Corinthian স্থাপত্যের নিদর্শন তো আছেই। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত করে চা পান সেরে বিদায় নেওয়ার পালা। 

ফেরার পথে আমরা আবার বাড়ির কাছে রাধুবাবুর ওখানে গিয়েছিলাম, ফিনিশিং টাচের জন্য। না না, ঐ দুটো ফ্রাই, দুটো কাটলেট, একটু চা, এই আরকি। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে একটু শরীরে তাগত আনবো না, কি বলেন? 

muttonkabiraji, kolkatastreetfood, kolkatadiary, foodblogger, foodlover, foodlove, Radhubaburdokan

আজকের সফরে বেজায় মিস করেছি কিছু সঙ্গীকে৷ তবে, পরেরবার, সে এক দারুণ আনন্দের ব্যাপার হবে এ-ই আশাতেই রইলাম। আজ আসি, কেমন?




Thursday, May 19, 2022

মরু দেশের টুকিটাকি (খাদ্য সফরের পঞ্চপল্লব )


"ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন, চরণতলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন..."

 বিশ্বকবি তাঁর দিগন্তবিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে লিখলেও আমার জন্য সেটা এসে ঠেকেছে রসনায়। মানে, এই মুঘলাই, আরবীয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস এবং প্রচলিত, খ্যাত, আবার একান্ত নিজস্ব যে পদের বিভিন্নতা, আগ্রহ তো জাগেই, তাই না? 

কিছুকাল আগে শুনলাম আমাদের শহরে রেস্তোরাঁ হয়েছে যেখানে একেবারে মরু দেশের কায়দায়, সজ্জিত সান্নিধ্যে আপ্যায়ন করা হচ্ছে! বেশ ভালো, তখনই স্থির করে ফেলা গেলো একবার সচক্ষে দর্শন, এবং আহারাদি সম্পন্ন করে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করে আসতে হবে। তাই, আমার বন্ধুবান্ধব, খাদ্যরসিক, যারা পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রে পিছপা নয়, সবাই মিলে হাজির হলাম পার্ক সার্কাসের "বার্কাস" রেস্তোরাঁয়। 


আমরা যখন উপস্থিত হলাম, একে একে দুয়ে দুয়ে, রেস্তোরাঁ প্রায় পূর্ণ, কারণ সহজ, আজ রবিবাসরীয় তিথিতে কে-ই বা ঘরের কোণে থাকতে চায়? রেস্তোরাঁ সুসজ্জিত, সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো "দরবার", সুন্দর মখমলি গদী বিছানো, ও তাকিয়া রাখা, কাষ্ঠনির্মিত মেজ, যেখানে খাদ্যপানীয় বাসনাদি রেখে খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। আমরা ঠিক করেছিলাম, বলা ভালো প্রধান কারণ এখানে আসার, "লাহাম মান্ডি", যা কিনা বিরিয়ানির একটি আরবীয় সংস্করণ, সেটা চেখে দেখতে হবে। এছাড়া, শেষ পাতে আসবে "কুনাফা", বা "Knafeh"। 

প্রথমেই আমরা সুন্দর এই পরিবেশের আনন্দ অনুভব করলাম, ও তারপর বললাম সূচক হিসেবে "চিকেন শূরবাঁ", যা অবশ্যই আরবীয় স্যুপ, আর "শিস তাউক", বা "চিকেন শীস কেবাব" আনা যাক। মৃদু  স্বাদের স্যুপ, ও নরম আঁচে সুপক্ব মাংসের কেবাব সত্যিই সুন্দর; সহজপাচ্য ও সুস্বাদু। ততক্ষণে অন্যান্য "দরবারে" মান্ডির আনাগোনা দেখে আমাদেরও কৌতূহল রসনা ও মস্তিষ্ক দুই-ই সচল করে তুলেছে! আমরা সবাই-ই যাকে বলে উদরপূর্তি শুধু নয়, মানসিক তৃপ্তিতে বিশ্বাসী, তা-ই যখন বিরাটকার কাংস্যনির্মিত থালায় সুসজ্জিত লাহাম মান্ডি এলো, সে এক দারুণ আনন্দের, মন ভালো করার মুহুর্ত! 

Arab Cuisine, Arbi Food, shish tauk, shish kebab, kolkata street food, food blogging, food bloggers, food blog, kolkata
শীস তাউক

Sorba, Chicken Shorba, Arbi Cuisine, Arab Cuisine, Kolkata Street Food, Food Blogger, Food Blog, Kolkata, Food Blogging
চিকেন সূর্বা

চারপাশে রন্ধিত মশলাদি দেওয়া চাল, অর্থাৎ এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, স্টার আনিস ইত্যাদি দিয়ে, এবং মধ্যমণি হয়ে বিরাজমান মাংস খণ্ড, এমন নরম তুলতুলে সুসিদ্ধ মাংস আমি কখনো খাইনি, যা এই পরিমাপের! মান্ডি রান্না করা হয় পিট কুকিং পদ্ধতিতে, যা বিভিন্ন দেশে, ও স্থান অনুযায়ী কিছুটা বদলায়, বদলায় উপকরণও। এখানে কিভাবে করা হয়েছে তা জানিনা, কিন্তু রান্নার প্রণালী ও প্রকার অতিক্রম করে মন ছুঁয়ে গেছে অবশ্যই, কারণ সাধারণত বিরিয়ানি খেয়ে যে ভারী অনুভূতি, সেটি এক্ষেত্রে হয়না। 

Mandi Biriyani, Laham Mandi Biriyani, Arabi Cuisine, Arbi Food, Kolkata Street Food, Food Blogger, Food Blog, Food Blogging
লাহাম মান্ডি বিরিয়ানি

এছাড়া, বন্ধুবান্ধবদের, প্রিয়জনের সঙ্গে একই থালায় ভাগ করে খাওয়ার মজা, আনন্দ, সে তো ভালো লাগারই কথা, সুযোগ হয়না, পরিস্থিতিও নেই, মনে পড়ে যাচ্ছিলো ছাত্রাবস্থায় হোস্টেলে খাওয়াদাওয়ার সময় হৈ-হুল্লোড়। 

যা-ই হোক, এটি খেয়ে মোটামুটি যা মনে হলো, চারজন নয়, এটা খাইয়েরা দুজনেই খেয়ে নিতে পারেন, বা তিনজন। তারপর, শেষ পাতে আরেকবার ঠাণ্ডা পানীয়, ও সেই ডেসার্ট পদ, বা মিষ্টি, কুনাফা। এই পদটিও মধ্যপ্রাচ্যের, কিছুটা গ্রীক বাকলাভার সঙ্গে মিল আছে, এবং এর অনেক সংস্করণ, রূপ আরব দুনিয়া থেকে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপেও খ্যাত, অর্থাৎ বালকান উপদ্বীপীয় অঞ্চলে। আমি মিষ্টি খুব একটা ভালোবাসি না, তবে ক্ষীরের মতো উপকরণ, উপরে ভাজা সেমাই ও শুকনো ফল, মোটের উপর মন্দ নয়। তবে, আজকের নায়ক লাহাম মান্ডি বেশ ভালো লাগলো, কারণ আগেই বলেছি, সুস্বাদু, ও সহজপাচ্য। 

Knafeh, Kunafa, Arabi Cuisine, Arbiu Food, Kolkata Street Food, Food Blogger, Fodd Blogging, Food Blog
কুনাফা

যা-ই হোক, খেয়েদেয়ে তো চুপচাপ বাড়ি ফেরার মানুষ আমার সঙ্গীরা নয়। আজকের সফরে প্রথমবার এসেছিলো চিরঞ্জয়ের স্ত্রী রিম্পা, ছোট্ট রিয়ান, ও আমাদের রায় বাবুর বন্ধু পিয়াল। পিয়ালের সঙ্গে আমাদের প্রথম আলাপ, অত্যন্ত সপ্রতিভ, মিষ্টভাষী, ও আলাপী, তার কাছে ঢাকার কাচ্চি নিয়েও কিছু আলাপচারিতা হলো। তারপর, চিরঞ্জয়রা আজকের মতো বিদায় নিলো, আমরা ছুটলাম একপাক প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে, গঙ্গার হাওয়ায় হজম ভালো হয় কিনা! সেখানে আরেকপ্রস্থ আড্ডা, গল্প, ও ছবির পালা। 

প্রতিটি দিনেরই শুরু ও শেষ হয় আরেকটি দিনের জন্য অপেক্ষায়, প্রত্যাশা ও পদক্ষেপের সন্ধিক্ষণে। আমাদের আজকের সফর ছিলো তেমনই একটি দিন, আগেরবারগুলোতে যারা ছিলো, তাদের বারবার মনে করে দুঃখ করছিলাম, আবার নতুনদের আসায় প্রাপ্তিও হলো। আগামীর জন্য আবার কিছু থাকবে, এই আশা নিয়ে আজকের মতো বিদায় নিলাম। 


রেস্তোরাঁর এই বিশেষ পদটি জানা গেলো হায়দরাবাদের একটি গ্রামের থেকেই সংগ্রহীত নিজস্ব মশলা ইত্যাদি থেকে তৈরি, তা সে যা-ই হোক, মন ভালো করে দিয়েছে সুন্দর সঙ্গ, আর সুন্দর যা, তা-ই তো সত্য। আমার আবার, সবার উপরে মন ভালো করাটাই সত্য, তার উপরে? নাই। 😊

Monday, March 14, 2022

"বইমেলার কড়চা ২"



সবাই-ই জানেন, আমাদের কলকাতার বইমেলার স্থান পরিবর্তন হয়েছে বেশ কয়েকবার। ময়দান থেকে পার্ক সার্কাস হয়ে মিলনমেলা ছুঁয়ে আপাতত ঠাঁই হয়েছে যেখানে, নাম বইমেলা প্রাঙ্গণ, ভরসা করি এই-ই বুঝি শেষ, অন্তত আমার মতো অলসের জন্য এটাই যথেষ্ট, এরপর কি কলকাতার বাইরে কলকাতা বইমেলা যাবো, বলুন দিকি? তা সে তো হলো, প্রথম দিন সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে এইচি, এবার তো একটু আধটু নেড়েচেড়েও দেখা দরকার। তাই, স্থির করলাম বৃহস্পতিবার, মানে যেদিন কাজকর্ম থাকে একটু ফাঁক পাই, সেদিনই যাওয়া যাবে। যেমন ভাবা তেমনই কাজ, বন্ধুদের সাথে কথা বলে নিলাম, তারা তো সবাই আমার মতো খেয়ালখুশি মতো চলেনা, কাজকর্ম রয়েছে! সেইমতন আলোচনা করে দেখা গেলো দু-চারজন ঠিকই সঙ্গী জুটে যাবে( আরে বই পড়বেনা, এরকম আবার হয় নাকি? অবশ্য হয়, সে কথা অন্য কোথাও)।

মেলার সবই ঠিক আছে, তবে ঐ যে কইছিলাম, ভরদুপুরে শুরু, আর এইবার তারিখটাও পিছিয়েছে, বেরোলাম যখন, রোদ্দুর তখন বেশ ভালোই মালুম হচ্ছে! যথারীতি গেট পেরিয়ে ঢুকেই খোঁজ নিলাম কে কোথায় আছে? দুজন ইতিমধ্যেই পৌঁছে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, আমিও যোগ দিলাম। এইবার দুয়েকটা ব্যাপার বেশ সুবিধাজনক মনে হয়েছে আমার, তার মধ্যে একটি হলো "বইমেলা ২০২২" মোবাইল অ্যাপ, যাতে বিভিন্ন স্টলের অবস্থান, নাম্বার ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া সহজ, নইলে সত্যি বলতে কি বারংবার একেকটা পছন্দসই, এবং প্রয়োজনীয় জায়গা খুঁজে বেড়ানো ঐ চত্বরে, চাট্টিখানি কথা নয়! আমি অবশ্য প্রাজ্ঞ সুকুমার রায়ের আপ্তবাক্য মেনে "এই দেখো পেনসিল, নোটবুক এ হাতে", মানে পকেটে নিয়ে গেসলাম, তাতে কোন বই কোথায় পাবো ইত্যাদি লেখা, সেইমতন শুরু হলো অভিযান.. কিন্তু, একবার দোকানে ঢুকলে, সারি সারি রংবেরঙের মলাটের বই সাজানো দেখলে, কোথায় খেয়াল থাকে? তখন মনে হয় "কী পাইনি, তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি"। হুম, প্রথম দিনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মণ্ডপে, মানে স্টলে এসে দুয়েকটি বই নেওয়ার কথা স্থির করেছিলাম, তাই সেখানে গেলাম। সেখানে অসাধারণ একটা সংগ্রহ দেখলাম "হারানো দিনের উজ্জ্বল গল্পমালা", যাতে সংকলিত আছে প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের রচিত নান স্বাদের ছোটগল্প। রয়েছেন সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, জলধর সেন, কার্তিক দাশগুপ্ত, সুবিনয় রায়, কুলদারঞ্জন রায়, পরিমল গোস্বামী, কে নন? এমন সংগ্রহের সুযোগ ছাড়ার প্রশ্নই আসেনা, তাই প্রথমেই সাতটি বইয়ের এই সেটটি নিলাম, মন ভালো হয়ে গেলো। সাথে নিলাম আশাপূর্ণা দেবীর গ্রন্থাবলীর দুটি খণ্ড, এমন লেখা যা-ই বলুন, আর হবেনা!!


এরপর আমরা একপ্রস্থ ঘোরাঘুরি করে বিভিন্ন বইপত্র দেখা শুরু করলাম, মূল উদ্দেশ্য একটা সম্যক ধারণা করে পরবর্তীতে কলেজ স্ট্রিট যাওয়া, এবং সেখান থেকে কেনাকাটা করা, যা-ই বলুন, মাঝেমধ্যে পকেটের কথাও চিন্তা করতে হয় বৈকি( এসব কথার কথা অবিশ্যি)... বর্তমানে যে প্রকাশনা সংস্থা গুলির বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানের আয়োজন দেখলাম। আমার বন্ধুদের থ্রিলারের দিকে বেশ ঝোঁক আছে, অনেকেরই লেখা পড়ে, এবং আমিও ওদের কাছ থেকে শুনে পড়েছি, যাদের মধ্যে কৌশিক মজুমদার, অভীক সরকার, প্রীতম বসু প্রমুখ বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছেন! তাদের অধুনা প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর দিকে নজর করলাম, দেখলাম আরও বেশ কিছু সংগ্রহ! এরপর সাহিত্য আকাদেমি স্টলে গিয়ে অন্যান্য ভাষার কীর্তিমানদের লেখা, কিংবদন্তী সাহিত্যিকদের রচিত বইগুলো দেখলাম, পছন্দ হলো শূদ্রক রচিত "মৃচ্ছকটিক" নাটকের বঙ্গানুবাদ যা সুকুমারী ভট্টাচার্যের করা, এবং ফণীশ্বর নাথ রেণুর হিন্দি রচনা সঞ্চয়ন। ওগুলো নেওয়া মনস্থির করে গেলাম একবার দে'জ পাবলিশার্স, সেখানে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট জনসমাগম হয়েছে, তা হোক, একটু ভিড় সয়ে নেওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। বাংলা সাহিত্যের মতো বৈচিত্র্য আর যে কোথায় আছে জানিনা, তা সেখানেও দেখা গেলো মতি নন্দী, দিব্যেন্দু পালিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল কর প্রভৃতি কালজয়ী লেখকের বই, আর আমার যথারীতি অবস্থা দাঁড়ালো, যে পারলে পুরো মেলাটাই মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু আমি তো পবনপুত্র নই, আর বইমেলাও ইয়ে, গন্ধমাদন পর্বত নয়কো, তাই এ যাত্রা অজেয় রায়ের দুটি বই "অলৌকিক ও রোমাঞ্চ সমগ্র", এবং "রহস্য সমগ্র" কিনেই ক্ষান্ত দিলাম। ইনি আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক, যাঁর লেখা পূজাবার্ষিকীর পাতায় পড়ে বড়ো ভালো লাগতো। তাই, কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত লেখাগুলো দুই মলাটের মধ্যে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হলাম বলাই বাহুল্য! এরপর দু পেয়ালা চা না পেলেই নয়, এবং ততক্ষণে আরও দুই তিন বন্ধু যথাক্রমে সুদীপ্ত দা, সৌরভ বসু, এবং নিরূপম দেব আমাদের সাথে, অর্থাৎ সপ্তর্ষি দেববর্মণ, এবং সুরিত মুখার্জির সাথে যোগ দিয়েছে। 


চা পান, এবং ধূমপান করে আমরা শিশু সাহিত্য সংসদের স্টলে পা দিলাম। নামে যা-ই হোক, বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে কোনো কথা হবেনা মশাই, শিশু হোক, বৃদ্ধ হোক, মানে আবালবৃদ্ধবনিতা যা-ই হোক, পছন্দসই বই নেওয়ার জন্য সবই করা যায়, তাই না? তা সেখানে আমাদের আরেক প্রিয় লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প সংগ্রহ নিলাম, শীর্ষেন্দু–সঞ্জীবের সঙ্গে অল্পবিস্তর আলোচনা করেই অবিশ্যি, মানে তাদের বই আপাতত রয়েছে কিনা, ইনি আমার বুকশেলফে শোভা বর্ধন করার জন্য আগমন করলে বড়োই বাধিত হবো!! তা সে যাক, এসব বইপত্র কিনে, বন্ধুদের সাথে তাদের সংগ্রহ নিয়ে আলোচনা করে যখন আকাশের দিকে চোখ পড়লো, দেখি সন্ধ্যা নামছে! চারদিকের উজ্জ্বল মুখগুলো আরেকটু ভালো লাগছিলো, ছোটদের হাতে নন্টে-ফন্টে, অথবা টিনটিন, ঠাকুরমার ঝুলি, কেউবা নিয়েছে প্রতিভা বসু, মহাশ্বেতা দেবী, কারোর প্যাকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে ঢোঁড়াই চরিত মানস, এমন সমাহারের জন্যই তো বারবার ছুটে আসা!! তখনই মনে পড়লো বহুকাল পূর্বের আরেকটি স্মৃতি, যখন তথাকথিত নিষিদ্ধ কল্পকাহিনীর আভাসের জন্য যেখানে ঢুঁ মারতাম, এখন যদিওবা সে পাট চুকেবুকে গেছে, আরেকবার ঝালিয়ে নিই না! তা-ই বেরিয়ে আসার আগে, যাওয়া গেলো মৌসুমী সাহিত্য স্টলে, সেখানে স্বনামধন্য পৃথ্বীরাজ সেনগুপ্তের "নীল ছবির নীল পরীরা" বইটি নিলাম, দোকানীর মুচকি হাসিটি চোখ এড়ায়নি। সব মিলিয়ে তখন শরীর বেশ ক্লান্ত হলেও মন চাঙ্গা, কারণ ঐ যে, এই একটি জায়গায় এসে সবকিছু ভুলে যেতে ইচ্ছে করে!!


বইমেলার আরেকটি সুব্যবস্থা আমার কাছে পর্যাপ্ত পানীয় জলের প্যাকেট, নইলে সত্যি মহা হয়, এতক্ষণ জলপান না করেও থাকা চলেনা, আর যত্রতত্র জলপান করাও যায়না, বোতল ফ্লাস্ক নিয়ে চলাফেরাও বিরক্তিকর, বিশেষত আমার মতো মানুষের পক্ষে, যার দুহাতে বই, এবং দশভুজা হওয়াও অসম্ভব! যা-ই হোক, সবকিছু মিলিয়ে আড্ডা, গল্প, এবং প্রিয় পরিবেশে ভ্রমণ, এই ছিলো আমার দ্বিতীয় দিনের বইমেলার সন্ধিক্ষণ। ফেরার পথে মনে হল এইবারের মত এই কি তবে শেষ? তারপরেই মনে হল হতেই পারে না! আরও একবার নাহলে ঠিক জমবে না! হ্যাঁ... তৃতীয়বার এসেছিলাম.... তবে সে গপ্পো পরের বার বলবো নাহয়।

যাঁরা বইমেলার কড়চা প্রথম পর্ব পড়েননি তাঁরা এখানে ক্লিক করলে পড়ে ফেলতে পারবেন প্রথম পর্বের অভিজ্ঞতা!

Friday, March 11, 2022

"বইমেলার কড়চা ১"

Kolkata Book Fair, Book Fair, Book Lovers, Creative Writing

"বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে....." বিশ্বকবির এই কবিতাটি জানেননা বোধকরি এমন কেউ নেই। ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে গন্তব্য, পথ, এবং পথের বাঁকের প্রতিটি দৃশ্য, নিসর্গ, বা মানুষের সাক্ষাৎ, সবই সুন্দর। নির্জনতা পছন্দ করেন যারা, তারাও এমন স্থানই সন্ধান করেন যেখানে বিজন বসে আপন মনের সাথে কথা বলা যায়। এসবের মধ্যে কোনো বাধাবিঘ্ন, ছোটখাটো অসুবিধা তাদের মোটেও থামিয়ে রাখতে পারেনা, পরেরবার নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা কোনো না কোনো কারণে একাধিকবার একটি জায়গায় যেতে চান, আন্তরিক টানে, যা অন্যদের পক্ষে হয়তোবা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। 

আমি মশাই সেরকম নই, বেড়াতে যাইনি তা নয়, কিন্তু যেতেই হবে এমন কথা নেই, বরং না যেতে হলেও খুব একটা দুঃখিত হইনা। আমি এমন একজন অদ্ভুৎ প্রকৃতির মানুষ, যে একাধিকবার দিল্লী গিয়েও আগ্রায় তাজমহল দেখিনি বহুদিন, যখন দেখেছি সে ঠাঠা রোদ্দুরে পায়ের চেটো প্রায় সেঁকে যাওয়া দুপুরে। আবার, গোয়ায় ঘুরতে গিয়ে সমুদ্রে না যাওয়া মানুষও খুব সম্ভবত আমিই, যাকে বলে বিরল। কিন্তু, একটি ব্যাপারে আমি একপায়ে রাজী থাকি, তা হলো কলকাতার বইমেলা। ছোটবেলায় বাবামায়ের হাত ধরে, বয়স বাড়তে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, আবার কখনো বা একাই চট করে এক পাক ঘুরে আসা, এটি আমি সাধারণ, বা অসাধারণ কোনো কারণেই ফস্কে যেতে দিইনা৷ 

আমাদের ছোটবেলায় তো বইমেলা হতো ময়দানে, সবাই-ই মোটামুটি জানেন। যাতায়াতের সুবিধা থাকলেও সেখানে বেজায় ধুলো, আর একপ্রান্তে একেকটি স্টল, সে এক দিকদারি যাকে বলে, কিন্তু কি আর করা, সেভাবেই ঘুরতে হতো, দুইহাতে বইয়ের প্যাকেট, সাথে আসা বাবামায়ের হাতেও ধরা বইয়ের প্যাকেট, আর সবশেষে বেনফিশের গাড়িটা থেকে মনমাতানো খাবার( আমার আবার ফিশফ্রাই, কবিরাজির ওপর একটু পক্ষপাতিত্ব চিরকালই 😋)। ভাবতাম যে বইগুলো কিনবো, মেলায় ঢুকে আর হিসেব থাকতোনা, যা-ই দেখি, মনে হতো এটা নেবো, সেটা চাই!! মা-বাবা কখনো বইপত্র কেনায়, পড়ায় বাধা দেননি, বরং প্রচণ্ড উৎসাহ যুগিয়েছেন, এখনো তাই-ই, এ অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার। 

তারপর কালে কালে বইমেলার স্থান পরিবর্তন হতে হতে পার্ক সার্কাস, মিলনমেলা প্রাঙ্গণ হয়ে আজ বর্তমানে সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্ক। তা হোক, বছরের এই একটা সময় আমার কলকাতার সবকিছুই খুব ভালো লাগতে থাকে। বিভিন্ন দেশের থীম, আমাদের চেনা প্রকাশনার পাশাপাশি অনেক নামনাজানা সংস্থার সাজানো ডালি, পরিবেশনা... কতকিছুই যে জানা হলোনা, তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আহরণের চেষ্টা। শুধুই তা নয়, লিটল ম্যাগাজিনের বিস্তার, অনামা শিল্পীর হাতের স্কেচ আঁকানো উৎসুক যুবক-যুবতী, নানান প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়, কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা, এক লহমার মধ্যে নিজের শৈশবকালেই ফিরে যাওয়া.... সবই তো এই পরিবৃত্তে। 

অতিমারীর জন্য দুটো বছর বইমেলা আয়োজিত হয়নি, এ যে কি যন্ত্রণার, বলে বোঝানো কঠিন। তা-ই, যখন ঘোষণা শুনলাম, ২০২২ বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২৮শে ফেব্রুয়ারী থেকে ১৩ই মার্চ, মন ভরে উঠলো আনন্দে। আমার জন্য একটা ভালো বিষয় এইটি, যে বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠের অনেকেই বইপ্রেমী, আমার চেয়ে বেশিই বই কম নন। তাই যেই না ব্যাপারটা শোনা, একটা প্ল্যান করে ফেলা গেলো যে, কবে যাওয়া হবে।

এইবারই প্রথম আমি বইমেলার উদ্বোধনের দিন গেলাম। এর আগে যতবারই গিয়েছি, ন্যুনতম দিন তিন-চার পরের থেকে। কিন্তু, ব্যতিক্রম এইবারই, কারণ এক বন্ধু পরদিনই শহর ছাড়ছে, কর্মব্যস্ত জীবনের যা স্বাভাবিক ব্যাপার। গিয়ে দেখলাম, কিছু কিছু স্টল তখনও গুছিয়ে উঠতে পারেনি, তোড়জোড় চলছে, কেউ বা বইয়ের সম্ভার গোছাতে ব্যস্ত, আবার কেউ ব্যানার ইত্যাদি লাগানোর কাজ করছেন। এরমধ্যেই মেলাপ্রাঙ্গণ পরিক্রমা করে মোটামুটি ধারণা করে ফেললাম যে, দিন কয়েক পরে যখন আসবো, কি কি বই অবশ্যই সংগ্রহ করবো, এবং গুরুত্বপূর্ণ স্টলগুলোর নং, অবস্থান ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্যাটালগ সংগ্রহ করে ফেরার পালা, তবে "ঝিমিয়ে এলো বইয়ের ঘোর, কেনার পালা সাঙ্গ মোর" নয়, বরঞ্চ বলতে পারেন, এটা সবে শুরু বইমেলার কড়চার। 
Kolkata Book Fair, Book Fair Memories, Creative Writing, Book Lover


Thursday, January 27, 2022

পুরানো কলকাতার গল্প: সাঁ সুশি

শুরুতেই বলে রাখি এই লেখার সঙ্গে কিন্তু জাপানি খাবার "সুশির" কোনও সম্পর্ক নেই! তাহলে নিশ্চয়ই ভাবছেন এই "সাঁ সুশি" আবার কি জিনিষ? আসুন তবে সাঁ সুশির গল্পটা শোনাই যাক।

সময়টা তখন ১৯ শতকের প্রথম দিক। সাধের শহর কলকাতাকে তিল তিল করে গড়ে তুলছে ইংরেজরা। বাণিজ্যের সঙ্গে আমোদ প্রমোদের দিকেও নজর দিয়েছে তারা। খাস বিলেতের মতোই কলকাতাতেও নাট্যচর্চার রমরমা। কলকাতার প্রথম থিয়েটার "প্লেহাউস" ১৭৫৩ তে শুরু হয়ে ১৭৫৬তেই বন্ধ হয়ে গেছে। উত্তরসূরী "নিউ প্লেহাউস" বা "ক্যালকাটা থিয়েটার" ১৭৭৫ থেকে ১৮০৮ সাল অব্দি চলে বন্ধ হয়ে গেল। এরপর সাহেব মেমদের নাট্যচর্চার জায়গা হয়ে উঠলো ১৮১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত "চৌরঙ্গী থিয়েটার"। কিন্তু ১৮৩৮এর মে মাসে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে গেল চৌরঙ্গী থিয়েটার! মাথায় হাত পড়ল সাহেবদের। নাট্যচর্চার অন্যতম জায়গাও যে নষ্ট হয়ে গেলো! বিপদকালে এগিয়ে এলেন সে সময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী ম্যাডাম এস্থার লিচ। মেমসাহেব ছিলেন সেই সময়ের চৌরঙ্গী থিয়েটারের যাকে বলে স্টার অ্যাট্রাকশন! যাই হোক... মূলত তাঁর উদ্যোগেই গোড়াপত্তন হলো নতুন থিয়েটার সাঁ সুশির। 

কলকাতার ওয়াটারলু স্ট্রীটে অবস্থিত সেন্ট অ্যান্ড্রুজ লাইব্রেরীর নীচের তলায় শুরু হলো সাঁ সুশি। প্রায় ৪০০ আসন বিশিষ্ট এই নতুন থিয়েটার অস্থায়ী ভাবেই তার যাত্রা শুরু করল ২১শে আগস্ট ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। একই সঙ্গে নতুন থিয়েটার হল তৈরীর কাজও জোরকদমে এগিয়ে যেতে থাকলো। অর্থসাহায্য করতে এগিয়ে এলেন অনেকেই। এঁদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য নাম লর্ড অকল্যান্ড (তখনকার গভার্ণর জেনারেল) এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর! অবশেষে ৮ই মার্চ ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে নিজের নতুন ঠিকানায়, অর্থাৎ সেইসময়ের ১০ নম্বর পার্ক স্ট্রীটে, আরও একবার যাত্রা শুরু করলো সাঁ সুশি! সুবিশাল এই অট্টালিকার নকশা তৈরী করেছিলেন জে ডাব্লিউ কলিন্স। শুরুর দিকে বেশ রমরমা ছিল এই নাট্য মঞ্চের। ম্যাডাম এস্থার লিচ নিজেই ছিলেন এখানকার ডাইরেক্টর এবং ম্যানেজার। কিন্তু ১৮৪৩ সালের ২রা নভেম্বর আচমকাই ঘটে গেলো দুর্ঘটনা! একটি দৃশ্যে অভিনয় করার সময় অন্যতম অভিনেত্রী এস্থার লিচের পরনের কাপড়ে আগুন ধরে যায়। গুরুতর আহত হন তিনি। এর কয়েকদিন পরেই, ২২শে নভেম্বর ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে, মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই মারা যান তিনি। 

এস্থার লিচের পর সাঁ সুশির দায়িত্বে আসেন তাঁরই সহকর্মী নিনা ব্যক্সটার। এরপর ১৮৪৪ সালে আবার দায়িত্ব বদল হয় এবং এবার দায়িত্ব তুলে নেন জেমস ব্যারি। মালিকানা বদল হলেও সুদিন আর ফেরে না সাঁ সুশির। অবশেষে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে বন্ধই হয়ে যায় সাঁ সুশি। মনে করা হয় বাংলা থিয়েটারের প্রসারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল চৌরঙ্গী থিয়েটার এবং সাঁ সুশির। 

একটি মজার তথ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করবো। এক সময় যেখানে ছিল পুরানো কলকাতার অন্যতম থিয়েটার সাঁ সুশি, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অন্য একটি বিখ্যাত বিল্ডিং। কোন বিল্ডিং? সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ!

sans souci, kolkata, history of kolkata, old kolkata,


Friday, January 21, 2022

পায়ে পায়ে পুরানো কলকাতা

 পুরানো কলকাতার প্রতি আমার একটা অদ্ভুত নেশা আছে। যদিও আমি মনে করি এই নেশার জন্য অনেকাংশে দায়ী স্বনামধন্য লেখক শ্রীপান্থ। কি দরকার ছিল মশাই "কলকাতা" বইটা ওইরকম ভাবে লেখার?? একেবারে কলকাতার নেশা ধরিয়ে তবে ছাড়লেন!! কিছুদিন আগে স্কুলের অন্যতম প্রিয় বন্ধু অনির্বাণ (কর্মসূত্রে মুম্বইয়ে থাকে এখন) যখন বললো "কলকাতা এসেছি.... চল একদিন বেরোই" তখন একটা প্ল্যান করে ফেললাম যাতে ঘোরাও হবে আবার পুরোনো কলকাতাকে কাছ থেকে দেখাও হবে। দুই বাল্যবন্ধু মিলে প্ল্যান করলাম ২রা জানুয়ারি বেরোবো। সঙ্গে যোগ দিল আমার বেটার হাফ মিতা। ঠিক করলাম ভিড় এড়িয়ে ঘুরবো। আর পুরোনো কলকাতার খোঁজেই যখন বেরোলাম তখন দুপুরের পেট পুজো কোনও পাইস হোটেলে সেরে নেবো। তারপর পায়ে হেঁটে একটু এদিক সেদিক। 


প্ল্যান অনুযায়ী শুরু করলাম জানবাজারের "সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমে" পেট পুজো করে। কলকাতার এই পাইস হোটেলের জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম। তারপর থেকে প্রায় ১০০ বছরের কাছকাছি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে খাবার পরিবেশন করছে এই হোটেল! অধুনা "বেঙ্গলি কুইজিন" হোটেল গুলোর মতো অ্যাম্বিয়েন্স এখানে পাবেন না। এই পাইস হোটেলে যেটা পাবেন সেটাই সবথেকে দরকারি..... সুস্বাদু খাবার! যাই হোক.... ভাত, ডাল, আলুভাজা, পোস্তর বড়া, সীম সর্ষে, দু রকমের মাছের ঝাল, মটন কষা আর চাটনি দিয়ে দুপুরের পেটপুজো সেরে ফেললাম। ভাবছেন এতো কিছু সাঁটিয়ে দিলাম কিভাবে? তা একটু পেটুক বটে আমরা 😁😁। অতঃপর? আরে বাবা বাঙালি তো.... এতকিছু খেলাম আর প্রাণটা এট্টু মিষ্টি পান মিষ্টি পান করবে না তা আবার হয় নাকি?? তাই আমিনিয়ার পাশে "তাজমহল পান শপ" থেকে মিষ্টি পান খেয়ে ফেললাম। দোকানদার মনিরুদ্দিন মিয়াঁ আবার মহম্মদ রফি সাহেবের একনিষ্ঠ ভক্ত! দোকান সাজানো রফি সাহেবের ছবি দিয়ে আর দোকানে বাজছে রফি সাহেবের গান! এহেন মানুষের দোকানের মিষ্টি পান খাসা বৈকি! অবশ্য পান খাবার আগে রানি রাসমণির বাড়ি দেখে নিয়েছি।


পেট পুজো পর্ব শেষে হাঁটা এগোলাম পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এখানে জরুরি কাজের জন্য মিতা আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করে ফিরে গেলো। তারপর এসপ্ল্যানেড মোড় থেকে বাস ধরে চললাম পরবর্তী গন্তব্য "মেটক্যাফ হল" এর দিকে। স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর মিলেনিয়াম পার্কের ঠিক উল্টো দিকেই দেখতে পাবেন ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো বিল্ডিং মেটক্যাফ হল। ১৮৪০ থেকে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত এই বিল্ডিংটির নামকরণ তৎকালীন গভর্নর জেনারেল চার্লস মেটক্যাফের নামে করা হয়। অনেকেই জানেন না এটি বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ্ ইন্ডিয়া দ্বারা পরিচালিত একটি মিউজিয়াম এবং এর বিশেষত্ব হচ্ছে পুরো মিউজিয়ামটি কলকাতার ওপর! কলকাতার জন্মলগ্নের অয়েল পেন্টিং, ফোটোগ্রাফ, সংস্কৃতি, সিনেমা, উৎসব প্রভৃতি জিনিষ নিয়ে সাজানো অভিনব এক মিউজিয়াম! ঢুকতে টিকিট বাবদ ২৫ টাকা লাগে। ভেতরে ছবি তোলা যায়। আমার তো দারুণ লাগলো। উল্টোদিকের মিলেনিয়াম পার্কের হৈ হট্টগোলের সম্পূর্ন বিপরীত চিত্র পাবেন এখানে। গুটিকয় কলকাতা প্রেমী ছাড়া খুব একটা কারুর দেখা এখানে পাবেন না!


মেটক্যাফ হল দেখে কিরণ শঙ্কর রয় রোড ধরে এগিয়ে চললাম.... পরের গন্তব্য রাজ ভবনের উল্টোদিকে অবস্থিত "সেন্ট জনস্ চার্চ"। ১৭৮৪ থেকে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত এই গির্জা কলকাতার তৃতীয় সবথেকে প্রাচীন গির্জা। শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দান করা জায়গায় তৈরী হয় এই গির্জা। তৎকালীন সময়ে একে "পাথুরে গির্জা" নামেও জানা যেত। ১৮৪৭ সাল নাগাদ সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল নির্মিত হলে এর গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। চার্চ ছাড়াও এখানে আরও কয়েকটি আকর্ষণ আছে। তার মধ্যে একটি নিঃসন্দেহে জোব চর্ণকের সমাধী। এছাড়াও দেখতে পাবেন দ্বিতীয় রোহিলা যুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, "বেগম" জনসনের সমাধী, লেডি ক্যানিংয়ের সমাধী, কুখ্যাত হলওয়েল মনুমেন্ট ইত্যাদি। চার্চ কম্পাউন্ডের ভিতরের পরিবেশ একেবারে শান্ত তাই জায়গাটিও ভালো লাগতে বাধ্য! এখানে প্রবেশমূল্য ১০ টাকা।


হলওয়েল মনুমেন্ট দেখার পর ইচ্ছে হলো একবার পুরোনো ফোর্ট উইলয়াম চত্বর থেকে ঘুরে আসি। তাই হাঁটা মারলাম বিবাদিবাগের দিকে। ভাবছেন হয়ত ফোর্ট উইলিয়াম তো সম্পূর্ন উল্টোদিকে তবে বিবাদিবাগের দিকে গেলাম কেন? আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরী প্রথম ফোর্ট উইলিয়াম এখানেই ছিল। ১৭৫৬ সালে সিরাজ-উদ-দৌলার ফৌজ যখন কলকাতা দখল করে তখন সেই যুদ্ধে পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম প্রায় ধুলোয় মিশে গেছিলো! সেবার সিরাজ কলকাতার নাম পাল্টে "আলিনগর" করে দিয়েছিল! আর সেই সময় এখানেই নাকি ঘটেছিল কলকাতার ইতিহাসের সেই বিতর্কিত অধ্যায় "ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি" বা "অন্ধকূপ হত্যা। হলওয়েল মনুমেন্ট সেই ঘটনার স্মৃতির উদ্দেশ্যেই তৈরী! পরে লর্ড ক্লাইভের তত্বাবধানে ১৭৫৮ সালে বর্তমান ফোর্ট উইলিয়াম তৈরীর কাজ শুরু হয়। শেষ হয় থেকে ১৭৮১ সালে। এখন সেই পুরোনো দুর্গের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দুটি হেরিটেজ বিল্ডিং.... একটি ফেয়ারলি প্লেস এবং অপরটি GPO! এতগুলো বছর পরে সেই পুরোনো দুর্গের চিহ্ণ খোঁজাটা অসম্ভব। তবে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দিকে GPOর শেষ মাথায় একটি ফলক বসানো আছে! প্রথম ফোর্ট উইলিয়ামের সীমা নির্ধারণ করা আছে ফলকটিতে। নীচে সিঁড়িতে ব্রাস লাইন আছে যেটা দিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের সীমানা বোঝানো হয়েছে.... যদিও এখন সেই ব্রাস লাইন অনেকটাই অস্পষ্ট। সত্যি বলতে হঠাৎ দেখলে কেউ এই জায়গার গুরুত্ব বুঝবে না.... তবে যারা আমার মত পুরোনো কলকাতার নেশায় পাগল.... তাদের কাছে এই জায়গা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ন!


পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের অবশিষ্ট সীমানা দর্শন করে দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে বাড়ির পথ ধরলাম। মহানগর কলকাতার ব্যাপ্তির তুলনায় আমাদের এই ঘোরা নেহাতই নগন্য। তবে কোভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুরোনো কলকাতাকে কাছ থেকে দেখার নেশায় যে আবারও বেড়িয়ে পড়বো সেটা বলাই বাহুল্য!!