Showing posts with label পায়ের তলায় সর্ষে. Show all posts
Showing posts with label পায়ের তলায় সর্ষে. Show all posts

Wednesday, April 26, 2023

বেনারস : শুরুর শুরু (দ্বিতীয় পর্ব)


বহুলব্যবহৃত রবীন্দ্রনাথের "দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশিরবিন্দু"... এটির আশ্রয় নিতেই হল। 

রবীন্দ্রনাথ তো একমাত্রিক কথা বলতেন না, এক্ষেত্রেও ধানের ক্ষেত শুধু নয়, দিশি/ঘরোয়া/নিতান্তই আটপৌরে আপনার কিছুকেই উপেক্ষা করে হাটে-বাজারে দৌড়ে সুখ-শান্তি খুঁজে বেড়ানোর কথাও বলেছেন মনে হয়। কিন্তু আমি তো একটু অলস, ঘোরাঘুরি করার নামে বেজায় জ্বর আসে! বেনারস অবশ্য ব্যতিক্রম, কারণ আগেই বলেছি। 

সময়ের সাথে সাথে যাত্রার বাহনের ধরণের পরিবর্তন, অভিযোজন তো হয়েছেই; সড়ক–জল–রেল–আকাশ কিছুই আর আয়ত্তের বাইরে নয়। কিন্তু আমি জানেন, রেলের যাত্রা কেই বেশি পছন্দ করি। রাত্তিরে যখন চারপাশটা নিঝুম হয়ে আসে, তখন ছোট্ট কোনো স্টেশন সাঁইসাঁই করে পেরিয়ে যাওয়া রেল... অন্ধকার জানালার ভেতর থেকে টিমটিমে আলো জ্বলা স্টেশন চত্বরটা, ফাঁকা বেঞ্চ, নীল–লাল অথবা হলদে–কালোয় লেখা অক্ষরগুলো চেষ্টা করে পড়ে ফেলা... অদ্ভুত আনন্দ হয়। আবার সে যদি হয় বড়ো কোনো স্টেশন, অথবা জংশন.. যাত্রীদের হাঁকডাক, নামা অথবা ওঠার জন্য তাড়া, ফেরিওয়ালার ডাক "চায়ে গ্রম.... এই-ই চায়েএএ", আবার মিনিট কয়েক পরে ঘুমিয়ে পড়া স্টেশনটি অপেক্ষা করে থাকে পরের সোয়ারি দেখার। আমাদের ট্রেনের সফর ছিল ১৩ ঘন্টার, বেশ আরামদায়ক এবং স্বস্তিকর। ট্রেন লেট করলে আবার মেজাজ বেগড়ানো... সে ভারী খারাপ ব্যাপার!! তা সে ট্রেন হাওড়া স্টেশন ছাড়লো রাত্তির আটটায়, আর আমাদেরও যাত্রা শুরু হলো। প্রথম স্টপ বর্ধমান হয়ে আস্তে আস্তে দুর্গাপুর, আসানসোল, চিত্তরঞ্জন হয়ে প্রবেশ করলো বিহারে। জসিডি, কিউল, মোকামা... স্টেশনগুলো দেখতে দেখতে ছোটবেলায় পড়া পূজাবার্ষিকীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো যেখানে লীলা মজুমদার, সুনির্মল বসু, হেমেন রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়দের লেখায় এই জায়গাগুলোর নাম পড়তাম। ট্রেনের যাত্রা আমাদের বেশ ভালোই কেটেছে দু তরফেই। পরদিন সকালেই তো সে-ই আকাঙ্ক্ষিত স্থান... বেনারস!

জয় বাবা ফেলুনাথ, জয় বাবা মানিকনাথ..... সবই তো তোমাদের ভরসায়, আসাটা যেন মনে থাকে। এইসব ভাবতে ভাবতে ট্রেন এসে দাঁড়ালো বেনারস স্টেশনে। আমাদেরও এই ছোট্ট সফরের গৌরচন্দ্রিকা পেরিয়ে মূলপর্ব শুরু হবে। আহহ্, শান্তি!! Debanjan Chatterjee আর Sudipta Saha Avi দার সঙ্গে নেমে অগ্রসর হলাম হোটেল অলকায় যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি ঠিক করতে। সঙ্গে লটবহর তো কিছু ছিলোনা মাথাপিছু একটি ব্যাগ, অতএব চলো পানসি বেলঘড়িয়া, থুড়ি বারাণসী। 😊

ক্রমশ....

Monday, April 24, 2023

"বেনারসের টুকিটাকি" (পর্ব ১)


কিতনি মুবারক হ্যায় ইয়ে শাম, অপনো সে অপনে মিলে হ্যায়ঁ.... 

হ্যাঁ, মিলন–আলাপ–আপনজনের সাথে ; সে হতে পারে মানুষের সাথে মানুষের, অন্য প্রাণীর সাথে, গাছের সাথে অথবা সবকিছু নিয়ে অপেক্ষায় থাকা কোনো জনপদের সাথেও! কাউকে যেমন দেখলে মনে হয় কতকালের চেনা, তেমন কিছু কিছু জায়গাতেও সেই টান থাকে হে! নইলে আমার মতো ঘরকুনো, অলস একজনকে নিয়ে যায় ঘরের থেকে নয় নয় করে সাতশো কিলোমিটার দূরে? কিছু দায় অবশ্য মানিকবাবুরও রয়েছে; জয় বাবা ফেলুনাথ পড়ে, সিনেমায় দেখে আরো কৌতূহল জাগলো যে! ফেলু মিত্তির বলেছিলেন কিনা "কাশী ইজ বেঙ্গলী'জ সেকেন্ড হোম লালমোহন বাবু।"

বারানসী, বেনারস, কাশী যে-ই নামই হোক, প্রায় বছর খানেক আগেই একবার অন্তত ঘুরে আসার ইচ্ছে জেগেছিল। আমার সাধারণত এরকম ইচ্ছে হয়না, কিন্তু এইবেলা হয়েছিল। কিন্তু কি জানেন, আমার বেড়ানোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হলো সঙ্গী। হুম, আমি একটু একঘেয়ে, বদমেজাজী, খাপছাড়া... তা-ই সঙ্গীকে অনেককিছুই মানিয়ে নিতে হবেক! তা সেরকম লোকজন কি হাটেবাজারে মেলে? কে স্বেচ্ছায় ঝামেলা পোহাতে চায় মশাই? তা সে যা-ই হোক, বাল্যবন্ধু  Debanjan Chatterjee র সাথে অনেকবারই আলোচনা হয়েছে ঘুরে আসা নিয়ে, কিন্তু হয়ে উঠছিলো না! সাথে Santanava Roy বাবু, Sudipta Saha Avi আর Kaushik Chakraborty দা'রও আসার কথা হচ্ছিলো। তবে এই বচ্ছর আসার পরেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, হ্যাঁ "উঠলো বাই তো কাশীই যাই"! ওখানকার খাদ্যসম্ভারের নানা খোঁজ পেয়েছিলাম, অলিগলিতে হয়তোবা অনেক অজানা কাহিনীর সন্ধান পেতে পারি, আর ঐ যে, নিজেদের সেকেন্ড হোম দেখে আসার লোভ.... একসাথে এতসব টুকরো হাসির ফোয়ারার আয়োজন কি সামলানো যায়? আমি তো মানুষ নাকি? তাই আমি, দেবাঞ্জন আর সুদীপ্ত দা ঠিক করলাম এইবার এপ্রিলের মাঝামাঝি, অর্থাৎ কিনা নববর্ষের প্রাক্কালে একবার দর্শন করে আসি সভ্যতার প্রাচীনতম এই নিদর্শন শহরটিকে। রায় বাবু আর রাণা দা এলে আরো জমতো কিন্তু বাধ সেধেছিল কিছু কাজ কিছু কাল... সে তো কিছু করার নেই! ট্রেনের নাম বিভূতি এক্সপ্রেস, স্টেশনের নাম চিরকালীন... হাওড়া। 

আমাদের যাত্রা শুরু এবং শেষের মেয়াদ বেশ ছোট, ১২ই এপ্রিলের বিকেল থেকে ১৬ই এপ্রিলের সকাল। অতএব, দায়দায়িত্ব কতটা বেড়েছিলো ভাবতেই পারছেন!! এই কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন সূত্রে ওখানকার রসনা তৃপ্তির হরেক ঠিকানা জোগাড় করা, ওখানকার ঘাট–রাস্তা–গলি–স্থাপত্যের দর্শন, আর আশেপাশের কিছু কিছু জায়গা পত্র দেখে সুস্থ শরীরে ফেরা; কারণ গ্রীষ্মকাল তো কারোর অধীনস্থ কর্মচারী নয়, আর আমাদের জামাইও নয় যে খাতির করবে! যা-ই হোক, শুরু থেকে শেষ... হলো ভালোই। 

একটি কথাই বলবো, বেনারসের মতো উচ্ছলিত, দিলখোলা, পুরাতনী ও আধুনিকতার বহমানা ধারাকে একইভাবে উজ্জ্বল রাখা শহর সম্পর্কে না গেলে কিস্যুই ধারণা করা যায়না! শুধু মন্দির আর জয়ধ্বনি নয়, ঘাট আর গলির ভিড় নয়; ওখানে প্রাণ আছে, তুমুল প্রাণের সঞ্চার আছে... দেখি, নিজের সীমিত ক্ষমতায় কতটা তার তুলে ধরতে পারি। পরবর্তী পর্ব নিয়ে শিগগিরই আসছি... কয়েকটা দিনের তো অপেক্ষা মোটে.... থাকছেন তো সঙ্গে?? ☺️

Friday, September 30, 2022

অথ কচুরি কাহিনী


ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারার পরে প্রাতঃরাশ, এই দিয়েই দিনের শুরু হয়, আর ইংরেজিতে একটা প্রবাদই আছে morning shows the day. আজকাল তো এই জলখাবারের নানান ধরণ এসেছে, সারা বিশ্বের খাদ্যাখাদ্য ডাইনিং টেবিলে শোভা পায়। তার উপর রয়েছে ডায়েটিংয়ের বাঁশি। তা সে যা-ই হোক না কেন, ভোরবেলার ঝলমলে রোদ আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে যায় কি দেখে? আরকিছুই নয়, কড়াইয়ে ঘি অথবা ডালডায় ভাজা সোনালী লালচে গোলাকার বস্তু দেখে; যার নাম কচুরি।

অরিজিৎ ঘোষ দার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিলো সকালবেলায় বিভিন্ন জায়গায়, তা সে উত্তর হোক বা দক্ষিণ কলকাতায়, কচুরি খাবে। একাজে সেকাজে সেটা কিছুদিন পিছিয়ে গেলেও মাথায় ছিলো বৈকি৷ কিন্তু, আমাদের জীবনের আরেকটি অঙ্গ তো আলস্য, সেটা ঠেকিয়ে এতো সকালে ছুটোছুটি করাও তো কঠিন। তাই, প্রায় চার মাস পরে আজ আমরা ক'জন বেরিয়ে পড়েছিলাম এই শুভকাজ সম্পন্ন করতে। রায় বাবু সামান্য অসুস্থ থাকায় যোগ দিতে পারেনি। তাই, আমাদের দেবাঞ্জন, সুদীপ্ত সাহা দা, অরিজিৎ ঘোষ দা আর এই অধম বেরিয়ে পড়লাম কচুরি অভিযানে। 

শুরুটা করলাম হরিশ মুখার্জি রোডের বিখ্যাত বলবন্ত সিংয়ের ধাবায়। অতিপরিচিত এই খাদ্যালয়ে হিংয়ের কচুরি আর আলুর তরকারি, কাঁচালঙ্কার আচার সহযোগে, কার না ভালো লাগে? এক প্লেটে চারটি গরমাগরম কচুরি, তারপর ভাঁড়ে গরম চা, মেজাজ খুশ হয়ে গেলো যাকে বলে! কিন্তু, সাথে আরেকটি কথাও আলোচনা করে নিলাম যে এরপরে তো আরো দুয়েকটা জায়গায় যেতে হবে, তাই ভাগযোগ করে খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর ট্যাক্সি ছুটলো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের আদি হরিদাস মোদকের দিকে। এটিও সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত পরিচিত বটে। প্রায় ২৫০ বছর ধরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এই স্থানের ব্যতিক্রমী চেহারা হলো পরিবেশনের ধরণে, কলাপাতায়। সেখানে পাওয়া গেলো কচুরি, এবং ছোলার ডালের তরকারি। বেশ সুস্বাদু, চটজলদি জায়গা পাওয়া যায়না সেটাই স্বাভাবিক। এখানে মোটামুটি খান তিনেক কচুরি গলাধঃকরণ করে ধীরেসুস্থে জলপানের পরে একটি সিগারেট ধরালাম।  

HaridasModak, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

উত্তর কলকাতায় এসে একটু গঙ্গা দর্শন না করলে কি হয়? তাই, পদব্রজে টুকটুক করে এগোলাম বাগবাজার মায়ের ঘাটের দিকে। সেখানে গঙ্গা পাড়ে বসে খানিকক্ষণ হাওয়া খেয়ে যাবো পটলার কচুরির পানে। পটলার কচুরি...... বাগবাজার গিয়েছেন অথচ এখানে ঢুঁ মারেননি এরকম লোক কে জানে আছে কিনা! ৯৩ নট আউট, স্টেডি ফুটস্টেপ, এবং অসাধারণ লাইন ধরে ড্রাইভ করে চলেছে। আহা, শীতকালের দোরগোড়ায় এসে একটু ক্রিকেটের উপমা দেওয়াই যায়, কি বলেন? এখানে কচুরির সাথে তরকারির স্বাদে আরেকটু প্রচলিত ধরনের ছোঁয়া পেলাম। ততক্ষণে পেট বেশ ভরেছে, এবং মন তো অবশ্যই। 

PotlarKochuri, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

কিন্তু, সব ভালো যার শেষ, তাই না? তা এদিকে এসে পুঁটিরাম হবেনা? না না, আমরা তেমনটা ঠিক নই। অতএব, করলে স্কোয়ারে অল্পসময় জিরিয়ে নিয়ে শেষ আখড়া কলেজ স্ট্রিটের পুঁটিরাম। সেখানে অবশ্য আরেকটু যোগ হলো কচুরির সঙ্গে টকদই, আর রসমালাই। আমাদের সুদীপ্ত দার একটু মিষ্টিমুখ না করলে কেমন খালিখালি লাগে কিনা! 

PutiramSweets, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

মন ভালো লাগে, চারপাশ কেমন যেন বদলে যায় সুখাদ্য গ্রহণের পরে। অতএব, এদিকের পাট চুকিয়ে আমরা গেলাম ধর্মতলায়। মশাই, ৪০/- টাকায় সেই লস্যি, উফফ!! খোয়াক্ষীর, কাজু, কিশমিশ, চেরি দিয়ে সুসজ্জিত। এটা এক গ্লাস খেলেই তো পেট ভরে যায়! 

Lassi, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর, বিদায় নেওয়ার পালা, কিন্তু আজ প্রাতঃরাশের জন্যে এই ছোট্ট সফর মনে থাকবে, অনেকদিন পরে সকালে ঘোরাঘুরি হলো, আর আমাদের খাদ্যসফরও আরেকটি ভোরেই শুরু হয়েছিল। পরেরবার অবশ্যই অন্যরকম আনন্দময় এক অধ্যায় নিয়ে আসবো এই-ই আশা। আপাতত, পুজো সব্বার ভালো কাটুক। ☺️

Wednesday, March 30, 2022

মর্গ্যান হাউসের অভিজ্ঞতা

 

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Heritage Building
সকাল বেলায় মর্গ্যান হাউস

ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে ইদানিং কালিম্পংয়ের মর্গ্যান হাউস নামটা বেশ জনপ্রিয়। অবশ্য তার একটা অন্য কারণও আছে। ব্রিটিশ কলোনিয়াল আর্কিটেকচারের অনন্য নিদর্শন এই মর্গ্যান হাউসের আবার "ভুতুড়ে" বাড়ি হিসেবে "সুনাম" আছে! আজকাল গুগলে একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন মর্গ্যান হাউসে রাত কাটানো লোকজনের রোমহর্ষক সব অভিজ্ঞতার গল্প। তাই ভাবলাম একবার এখানে গিয়ে থাকলে মন্দ হয়না! ভূতের দেখা পাই না পাই অন্তত একটা হেরিটেজ প্রপার্টিতে থাকার অভিজ্ঞতা তো হবে। 

Morgan House, rear view, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blogger, Travel Blog, Heritage building
বাংলোর পিছন দিকে

১৯৩০ এর দশকের প্রথম দিকে পাট ব্যবসায়ী জর্জ মর্গ্যান কালিম্পংয়ের দুরপিন দারা পাহাড়ের ওপর এই বাংলোটি তৈরী করেন। প্রায় ১৬ একর জায়গা জুড়ে স্থাপিত এই বাংলো মূলত বাগানবাড়ি হিসেবেই ব্যবহৃত হত। মর্গ্যান দম্পতির মৃত্যুর পর বাড়িটি ট্রাস্টিদের হাতে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়ির দায়িত্ব নেয় ভারত সরকার। পরে ১৯৭৫ সাল নাগাদ WBTDCLকে মর্গ্যান হাউস হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে অট্টালিকাটি "বুটিক হোটেল" হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এই বাংলোয় থাকার অভিজ্ঞতাই আজ ভাগ করে নেবো সবার সাথে।

Morgan House, Kalimpong, WBTDCL, travel blogger, incredible India, heritage  building, travle blog
গেট থেকে মর্গ্যান হাউস

Night view, Morgan house, kalimpong, West Bengal, beautiful Bengal,  travel blogger, travel blog
রাতের মর্গ্যান হাউস

মূল কালিম্পং শহর থেকে প্রায় ৩ কিমি বাইরে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ায় অবস্থিত হওয়ায় মর্গ্যান হাউসের পরিবেশ খুব শান্ত। বাংলোর সামনে এবং পিছনে আছে সযত্নে তৈরী বাগান এবং পাইন গাছের সারি। সকালে বাংলোর লনে বসে দার্জিলিং টি খাবার মজাই আলাদা! এখন ফুলের সিজন শুরু হওয়ায় বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছই রঙিন! আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখাও মেলে এখান থেকে। তবে আমাদের মন্দ ভাগ্য! আকাশ পুরো মেঘলা থাকায় "তেনার" দর্শন মেলেনি। এছাড়াও উপভোগ করতে পারবেন রাস্তার উল্টোদিকে "গ্রীন গেল গল্ফ কোর্সের" অসাধারণ দৃশ্য। মর্গ্যান হাউসের ভিতরে ঢুকলে মনে হবে মধ্যযুগীয় কোন বাড়িতে প্রবেশ করেছেন। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ৫টি ঘর এবং নীচে ডাইনিং হলের পাশে একটি ঘর আছে। ঘরের মেঝে কাঠের তৈরী। এমনকি প্রতিটি ঘরে ফায়ার প্লেস করা আছে... যদিও কোনোটাই ব্যবহার হয় না বর্তমানে। এখানে সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। খাবার দাবার বেশ ভালো এবং দাম আয়ত্তের মধ্যেই। এখানকার কর্মচারীদের ব্যবহার প্রচণ্ড ভাল এবং ট্যুরিস্টদের সাহায্যের জন্য এঁরা সর্বদাই প্রস্তুত।

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Green Gale Golf Course, Kalimpong
গ্রীন গেল গল্ফ কোর্স

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Green Gale Golf Course, Kalimpong
গ্রীন গেল গল্ফ কোর্স

ভাবছেন এত কিছু বললাম আর "তেনাদের" কথা কিছু বলছি না কেন? আরে থাকলে তো বলবো! নেটে তো অনেককিছুই পড়েছিলাম। কেউ নাকি রাতে লেডি মর্গ্যান এর হিল তোলা জুতোর আওয়াজ পেয়েছেন! কাউকে নাকি সকালে বাগানের কোন গাছের তলায় পাওয়া গেছে! আবার কেউ কেউ তো এত ভয় পেয়েছেন যে বাইবেল নিয়ে শুতে হয়েছে! বিশ্বাস করুন কিছুই নেই। সব গাঁজাখুরি গপ্পো! এখানকার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম বেশিরভাগ "ভূত শিকারী", যাঁরা নাকি এখানে রাতের বেলায় ভূতের দেখা পেয়েছেন, তাঁরা আদৌ এখানে থাকেননি! হয়ত এইসব রটনা আটকাতেই বোর্ডার ছাড়া বাইরের ট্যুরিস্ট প্রবেশ নিষেধ।

দুজন মানুষের কথা না বলে এই লেখা শেষ করলে খুব অন্যায় হবে। প্রথমজন রাজ বসু স্যার। সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারতে পর্যটনের প্রচার এবং উন্নতির বিষয়ে এনার ভূমিকা অসামান্য! গত ২২শে মার্চ আমার কন্যার জন্মদিন ছিল। ঘটনাচক্রে সেদিন রাজ্য সরকারের তরফে মর্গ্যান হাউসে একটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম রাখা হয়েছিল। ট্রেনিং নেবেন স্বয়ং রাজ বসু স্যার। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমার এবং আমার স্ত্রীর কথোপকথনের সময় মেয়ের জন্মদিনের ব্যাপারটা ওনার কানে যায়। আমাদের সম্পূর্ন অবাক করে দিয়ে রাজ বসু স্যারের উদ্যোগে এবং মর্গ্যান হাউসের বাকি কর্মচারীদের সহায়তায় বার্থডে কেকের আয়োজন করা হয় এবং ছোট্ট একটি সেলিব্রেশন করা হয়! বেড়াতে গিয়ে এইরকম আতিথেয়তা সত্যি মন ছুঁয়ে গেল। দ্বিতীয়জন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শুভঙ্কর বাবু। এই ভদ্রলোকের ব্যবহার অসাধারণ। সবসময় হাসি মুখে সাহায্য করতে পাশে পাবেন শুভঙ্কর বাবুকে। আসলে এনাদের মত মানুষদের জন্যই সম্পূর্ন অচেনা জায়গায় থাকার অভিজ্ঞতাও অসাধারণ হয়ে ওঠে! আবারও ফিরে যাবার ইচ্ছে জাগে মনে।

কন্যার জন্মদিন উদযাপন। একদম ডান দিকে রাজ বসু স্যার। একদম বাঁদিকে শুভঙ্কর বাবু।

মর্গ্যান হাউসের ঘরের বুকিং এবং ট্যারিফ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবেন WBTDCL এর ওয়েবসাইটে। রুম বুকিং একমাত্র অনলাইনেই করা যায়। আসল মর্গ্যান হাউসে থাকার জন্য ওয়েবসাইটে "মর্গ্যান হাউস ট্যুরিজম প্রপার্টি" সিলেক্ট করে বুকিং করতে হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে মর্গ্যান সাহেবের বাংলোয় আপনারও থাকার সৌভাগ্য হয়ে যাবে।

Tuesday, March 1, 2022

ময়নাগড় : An Island Within An Island

রোজকার জীবনের ব্যস্ত রুটিনের মধ্যে যখন হাঁফিয়ে উঠি তখন ইচ্ছে করে কোথাও একটু ঘুরে আসি। কিন্তু বড় ট্যুর করা তো সবসময় সম্ভব নয়। পকেটের ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে। তাই কম খরচে একদিনেই ঘুরে আসা যায় এইরকম একটা ট্যুর প্ল্যান করে গত রবিবার, অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি, বেড়িয়ে পড়লাম। পার্টনার হিসেবে বন্ধু শুভ্র। দু-একটা জায়গা দেখে রেখেছিলাম শনিবার দিন। সেসবের মধ্যে থেকে বেছে নিলাম পূর্ব মেদিনীপুরের মায়নাগড়। প্ল্যান অনুযায়ী সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পৌঁছে গেলাম প্রথম গন্তব্যস্থল এসপ্লানেড। সেখানে SBSTC বাস স্ট্যান্ড থেকে হলদিয়াগামি বাস ধরে নিমতৌড়ি। নিমতৌড়ি নেমে টোটো রিজার্ভ করে চললাম মূল গন্তব্য "ময়নাগড়" বা ময়না রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।

Moynagarh, moyna chaura, historical place, history of west bengal, incredible india
ময়নাগড়ের প্রবেশ দ্বার

টোটোতে প্রায় ২৫ মিনিট লাগলো ময়নাগড় পৌঁছাতে। জায়গাটার আসল নাম "ময়নাগড়" বা "কিল্লা ময়না চৌরা"। তবে স্থানীয়দের কাছে ময়না রাজবাড়ি নামটাই বেশি প্রচলিত। ওড়িয়া ভাষায় "চৌরা" শব্দটির অর্থ "জল বেষ্টিত উঁচু ভূমি"। আসলে প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত বন্দরের প্রায় ১৬ কিমি পশ্চিমে কেলেঘাই, কংসাবতী এবং চান্ডিয়া নদী পরিবেষ্টিত এক দুর্ভেদ্য গড় ছিল ময়না চৌরা। প্রবেশ করার সময় প্রধান ফটকের গায়ে একটি লেখা চোখে পড়বে... "An Island Within An Island"। ময়নাগড়ের ভৌগলিক অবস্থান প্রমাণ করে গেটের লেখাটা কতটা সত্যি! বর্তমানে ২টি পরিখা ঘেরা দ্বীপটি সত্যিই An Island Within An Island! 

একসময় "ধর্মমঙ্গল" কাব্যের নায়ক পাল বংশের রাজা লাউসেনের রাজধানী ছিল ময়নাগড়। পাল বংশের শাসনের পরবর্তী পর্যায়ে ময়নাগড় সম্ভবত পরিত্যক্ত ছিল। অনেক পরে এই জায়গা দখল করে শ্রীধর নামে এক জলদস্যু। সেসময় উৎকলরাজের আদেশে সবংয়ের রাজা গোবর্ধনানন্দ শ্রীধরকে পরাস্ত করে ময়নাগড়ের অধিপতি হন। খুশি হয়ে উৎকলরাজ গোবর্ধনানন্দকে "বাহুবলীন্দ্র" উপাধি দেন (বর্তমানেও ময়না রাজপরিবার এই উপাধি ব্যবহার করে থাকে)। আনুমানিক ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে বাহুবলীন্দ্র রাজবংশ নিজেদের রাজধানী "বালিসিতা" থেকে ময়নাগড়ে স্থানাতরিত করেন। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেসটিংস ময়নাগড় দখল করেন এবং তার সঙ্গেই শেষ হয় বাহুবলিন্দ্র রাজবংশের রাজ্যপাট। কথিত আছে শেষ স্বাধীন রাজা জগদানন্দ বাহুবলীন্দ্র নিজের বিশ্বস্ত অনুগামীদের সঙ্গে মাটির নীচে একটি গুপ্ত কক্ষে আত্মগোপন করেন এবং জীবদ্দশায় কোনোদিন আর বাইরে আসেননি। 

War Memorial, Moynagarh, Moyna Chaura, history of West bengal, Incredible India
ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ

রাজা গোবর্ধনানন্দ ময়নাগড় অধিগ্রহণ করে প্রথমেই সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে নজর দেন। তিনটি পরিখা (Moat) খনন করে মূল রাজবাড়িটি ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা করেন তিনি। প্রতিটি পরিখার মধ্যবর্তী উঁচু জমিতে কামান বসানো থাকত। এছাড়াও ঘন কাঁটা বাঁশের ঝার দিয়েও ঘেরা থাকত দ্বীপের চারপাশ। বর্তমানে তৃতীয় পরিখাটির কোনও চিন্হ দেখতে পাওয়া যায়না। দ্বিতীয় পরিখা যার নাম "মাকরদহ", সেটিও রাস্তা তৈরীর স্বার্থে অর্ধেক বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে রয়ে গেছে "কালিদহ"। প্রায় ২০০ ফুট চওড়া এই পরিখা পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় ময়না রাজবাড়িতে। পেরোনোর একমাত্র মাধ্যম নৌকা। 

Moynagarh, Google Image, Moyna Chaura, history of West bengal, Incredible India
গুগল আর্থে ময়নাগড়, কালিদহ এবং মাকরদহ

এখানে ১২টা অব্দি নৌকা চলাচল করে। তার আগে গেলে নৌকা করে কালিদহের এক চক্কর ঘুরে আসতে পারবেন। আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১২:৩০টা হয়ে গেছিল। স্বাভাবিকভাবেই কোনও মাঝি ছিলেন না। তবে কলকাতা থেকে রাজবাড়ি দেখতে এসেছি শুনে এক সহৃদয় ভদ্রমহিলা নৌকা পার করে দিলেন। কালিদহ পেরোনোর সময় চারপাশের নারকেল গাছের সারী দেখে অনেকটা কেরলের ব্যাক ওয়াটারের মতো লাগবে। সেই অর্থে ময়নাগড়কে বাংলার "ব্যাক ওয়াটার" বলা যেতেই পারে!

Kalidaha, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India, Moat
কালিদহের পাড়ে নারকেল গাছের সারী, অনেকটা কেরলের ব্যাক ওয়াটারের মতোই

ওপারে পৌঁছে চললাম রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। ঢোকার মুখে একটি ভগ্নপ্রায় তোরণ দেখা যায়। সংস্কারের অভাবে তার অবস্থা শোচনীয়। তারপরে ঘুরে দেখলাম রাধেশ্যাম জিউ মন্দির এবং সংলগ্ল নাটমন্দির। মন্দির বন্ধ হয়ে গেছিল তাই বিগ্রহ দর্শন সম্ভব হয়নি। তবে শুনলাম রাস উৎসব খুব ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয় এখানে। মন্দিরের পাশেই রাজবাড়ি। দোতলার বারান্দায় একজনকে দেখতে পেয়ে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। কলকাতা থেকে এসেছি এবং রাজবাড়ি দর্শনে আগ্রহী জেনে অনুমতি দিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকের নাম মনে নেই তবে পদবী দাস সেটা মনে আছে। তাই দাস বাবু বলেই সম্বোধন করবো। উনি সম্ভবত কেয়ারটেকার। এরপর উনি নিজেই বেশ দায়িত্ব সহকারে ঘুরিয়ে দেখলেন বাহুবলীন্দ্র রাজাদের বাড়ি। দোতলা এই রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তবে বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে দেখলেই বোঝা যায়। রাজবংশের কেউ বর্তমানে এখানে থাকেন না। 

Nat Mandir, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
নাটমন্দির

Radheshyam Jiu Temple, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
রাধেশ্যাম জিউ মন্দিরে ভিতরে

Radheshyam Jiu Temple, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
রাধেশ্যাম জিউ মন্দির

দাস বাবুর সঙ্গে ঘুরে দেখলাম রাজবাড়ি এবং গল্পের মাধ্যমে রাজবংশের ইতিহাস শুনলাম। তিনি বললেন রাজবংশের স্ত্রীরা একবার রাজবাড়িতে প্রবেশ করলে আমৃত্যু এখানেই থেকে যেতেন। এমনকি অন্দরমহলের বাইরে যাওয়াতেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। রাজবাড়ির ভিতরে একটি গুপ্ত কক্ষ দেখলাম যেখানে বিভিন্ন জ্যামিতিক শেপের কুলুঙ্গি করা আছে। সম্ভবত এই ঘরটি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার কাজে ব্যবহৃত হতো। এখানে একটি শান বাঁধানো তোরঙ্গ আছে যার ভিতরে নাকি লুকোনো আছে গুপ্তধন! তবে সেটা কেউ কোনওদিন কেনো খুলে দেখেনি সেটা ঠিক বোধগম্য হল না। এরপর রাজবাড়ির দোতলা, নাটমন্দির এবং প্রায় ২০০ বছরের পুরানো একটি কাঁঠাল গাছ দেখলাম। রাজবাড়ি দর্শন শেষে দেখলাম পেছনের জঙ্গলে পুরানো রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ। দাস বাবু বললেন ওই জঙ্গলেই নাকি এককালে অপরাধীদের শুলে চড়ানো হতো! সেসময় গড়ের নিরাপত্তার জন্য কালিদহের জলে ছাড়া থাকত কুমির! 

Moyna Rajbari, Moyna Palace, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
রাজবাড়ির ভিতরে

Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
কুলুঙ্গি ঘর। এই বাঁধানো তোরঙ্গের ভিতরেই নাকি আছে গুপ্তধন!
Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
বিভিন্ন জ্যামিতিক শেপের কুলুঙ্গি

পুরানো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে চললাম লোকেশ্বর শিব মন্দির দেখতে। আটচালার ধাঁচে তৈরী এই প্রাচীন মন্দিরটি। কথিত আছে মন্দিরের বিগ্রহ লাউসেনের আমলে প্রতিষ্ঠিত। যুদ্ধে যাওয়ার আগে উনি এখানে পুজো দিয়ে যেতেন। মন্দিরের গায়ে প্রাচীন টেরাকোটার কাজ চোখে পড়ে। মন্দির বন্ধ থাকায় বিগ্রহ দর্শন করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত গোটা দ্বীপে লাউসেনের সময়ের এই একটাই স্মৃতি চিন্হ অবশিষ্ট আছে। মন্দিরের উল্টোদিকে মনুমেন্ট আছে যেখানে জগদানন্দ বাহুবলীন্দ্রের সঙ্গে ওয়ারেন হেস্টিংসের যুদ্ধের কথা উল্লেখ আছে। এই দুটি মন্দির ছাড়াও এখানে একটি গাজী পীরের মাজার এবং একটি ধর্ম ঠাকুরের থান আছে। লোকেশ্বর শিবমন্দির দেখে এবং দাস বাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম খেয়াঘাটের দিকে। এবারও সেই সহৃদয় ভদ্রমহিলা (কোলে নিজের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে) অনায়াসেই আমাদের ওপারে পৌঁছে দিলেন। 

Lokeshwar Temple, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
লোকেশ্বর শিব মন্দির

Terracotta Work, terracotta Sculpture, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ

Terracotta Work, terracotta Sculpture, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ


Sculpture on temple wall, temple sculpture, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
মন্দিরের গায়ের কারুকার্য

Sculpture on temple wall, temple sculpture, Moynagarh, History of West bengal, Incredible India
প্রহরী

ময়না রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা দেখে হয়তো খুব একটা আহামরি কিছু লাগবে না। তবে জায়গাটির সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস জানলে সত্যি অবাক লাগবে! আসলে অনেক সময় অনেক সাধারণ জয়গাকেও তার সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস বিশেষ করে তোলে। বলতে পারেন ময়নাগড়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেইরকমই! নৌকা পারাপারের সময় ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম "এইভাবে নৌকা চালাতে সমস্যা হয়না"? জবাবে তিনি বলেছিলেন "নৌকা চালাতে না জানলে পেটের ভাত জুটবে না"! মঙ্গলকাব্যের ঈশ্বরী পাটনির মতোই এই মহিলাও পেটের টানে নৌকা চালানো রপ্ত করে নিয়েছেন! সত্যি বলতে, ময়নাগড় না আসলে জানতেই পারতাম না কি অসাধারণ এক ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই দ্বীপের মধ্যে! কালিদহের অপর পাড়ে আমাদের টোটোওয়ালা দাদা অপেক্ষায় ছিলেন। আমরা যেতেই তিনি টোটো ঘুরিয়ে আবার নিমতৌড়ির দিকে রওনা দিলাম। আমাদের পিছনে, কালিদহের অপর পাড়ে পড়ে রইল বাংলার এক অজানা ইতিহাস!

নিমতৌড়ি ফেরার সময় ড্রাইভার দাদা বললেন টোটো স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৬ কিমি দূরে তমলুক রাজবাড়ি। চাইলে নিয়ে যেতে পারেন। হাতে সময় ছিল তাই বেশি না ভেবেই সেখানে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। তবে সে গল্প নাহয় পরেরবার শোনাবো।

Thursday, February 17, 2022

MESMERIZING TAJMAHAL ON FULL MOON NIGHT

Taj Mahal, Incredible India, Travel Blog, Travel Blogging, Indian History, Taj Mahal
Taj Mahal at night

“You know Shah Jahan, life and youth, wealth and glory, they all drift away in the current of time. You strove therefore, to perpetuate only the sorrow of your heart? Let the splendor of diamond, pearl and ruby vanish? Only let this one teardrop, this Taj Mahal, glisten spotlessly bright on the cheek of time, forever and ever.”- Rabindranath Tagore

 

Nobel Laureate and world renowned poet Rabindranath Tagore’s quote dedicated to the Taj is perhaps one of the best to describe its’ beauty. The word ‘Taj’ originates from Persia and it literally means a ‘Crown’. True to its meaning, Taj Mahal is indeed considered to be the ‘Crown of the Palace’!!

It took 20 long years to complete the Taj Mahal (1632-1653) and since then it has been an eternal symbol of beauty and love. Indeed, timeless love it was which made the Mughal Emperor Shah Jahan build this white marble mausoleum in the memory of his beloved wife Mumtaj Mahal!

Well… you can easily come to know a lot about Taj Mahal across the internet as there are numerous articles describing the history, the engineering marvel of Taj, the love story of Shah Jahan and Mumtaz etc. Today I am not here to discuss all those stories…. Rather I want to share with you my experience of viewing Taj Mahal on a full moon night!

Taj Mahal has been a center of tourist attraction since long. It was declared as the winner of the ‘New 7 Wonders of the World’ initiative long back in 2007. But the Taj Mahal has been attracting its admirers from all over the world since its completion. I had read about the mesmerizing view of Taj mahal on a moonlit night in a novel and since then I had cherished the dream of viewing the Taj Mahal on a full moon night. The opportunity finally came on 12th November, 2019, the night of ‘Guru Purnima’ (Guru Nanak Jayanti).

My trip to Agra was a part of the famous ‘Golden Triangle’ tour with my family. Since the ticket for night view Taj Mahal is not available for purchase online, I was a little concerned about the availability of tickets as the stock is limited. However, I managed the tickets through a travel agent (after agreeing to pay some extra amount) and was finally able to view the magnificent Taj Mahal on a full moon night.

Night viewing of Taj Mahal is allowed from two days before the date of full moon and continues till two days after the date of full moon. The tourists are allowed from 8:30 PM onwards and the viewing continues till 12:30 AM with approximately 50 visitors per batch (8 batches are allowed per day). Maximum viewing time is 30 minutes per batch. As per the instructions printed in the ticket, I had to report to the Shilpagram gate by 8 PM with my family members. After verifying the ID details and passing through almost four security checks, we finally boarded a battery operated bus along with fellow visitors (mostly foreigners) which took us to the main gate of the Taj Mahal. Thereafter, following another round of verification and security check, we were finally allowed inside the Taj mahal!! After around 5 minutes, all the spot lights were switched off and in the darkness the Taj Mahal was there infront of us!! Although the infamous fog of Delhi and Agra region during that time of the year played spoilsport to some extent, but the Taj mahal was a sheer visual treat under the full moon!! It took around another 5 minutes or so to adjust my vision in the darkness and then it was there right infront of me!! My long desired wish of viewing Taj Mahal on a full moon night eventually fulfilled!!

The much coveted ticket

Taj mahal, Night View of taj mahal, chandelier, Incredible India, Indian History, Travel Blog, Travel Blogger
A Chandelier

Taj Mahal night view, Taj Mahal, Incredible India, Indian history, historical monuments, travel blog, travel blogger

I tried to capture the moment with my Nikon D-3200 35mm Low Light lens but the light was very insufficient to capture a perfect moment. The grain visible in the pictures is due to the fog out there. I am not a novelist who can perfectly describe the moment by using perfect literary verses or a poet who can pen down a poem or two describing this moment perfectly, all I can say is the feeling was wonderful, something words cannot describe!! So if you also have a desire to view Taj Mahal on a full moon night, just don’t delay anymore…. Experience it with your own eyes and treasure the memory forever!!

SOME MUCH NEEDED INFO:

·    Tickets for night view of the Taj Mahal are available 24 hours before the actual date of viewing from the counter of ASI office at Agra. Please click here for pricing and other details. Keeping in mind the limited availability of tickets, I would suggest that you better contact any Agra based travel agent to collect the tickets on your behalf if it is not physically possible to collect the tickets. They might charge a little extra as handling charges, but trust me the view will compensate all.

·       Be sure to carry your Photo ID / Passport for verification and ofcourse don’t forget to carry the ticket. A copy of Photo ID / Passport is also required at the time of purchasing tickets.

·    No electronic gadgets are allowed inside. Mobile phones, headphones / headsets, laptops etc. are strictly not allowed. Even camera tripod is not allowed inside. Only the camera and lenses are allowed provided you carry them on your hand. Backpacks are also not allowed. Locker facility is available to deposit all the electronic items.

·    Food items and water bottle are not allowed. Although, the guards allowed us to carry water bottle for my 2 year old daughter on request.

·      The area is well guarded by the CISF and you have to go through multiple security checks. So be sure not to carry anything which can be treated as a weapon.

·     Taj Mahal is our pride and a World Heritage Site…. so please do not litter or spit around. Also, refrain from committing any nuisance. Enjoy the beauty of the Taj and cherish the memory forever.

Though I visited during November, the local guides informed me that the best time to view Taj Mahal on a full moon night is during the months of March-May.

Wednesday, February 16, 2022

নবাব নগরীর অভিজ্ঞতা




নবাবদের নগরী লখনউ। শহরটার সঙ্গে আমার পরিচয় কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই। ফেলু মিত্তিরের অ্যাডভেঞ্চার "বাদশাহী আংটি" মনে পড়ে? আরে সেই যে ধুরন্ধর বনবিহারি বাবুর হাত থেকে বাদশাহী আংটি উদ্ধারের গল্প... তার সূত্রপাত তো এখানেই! স্কুলের ইতিহাস বইয়ে লখনউ এর কথা পড়েছিলাম বটে তবে ওই বাদশাহী আংটির লখনউ বর্ণনাই মনে দাগ কেটে গেছিল। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল একবার হলেও যাবো.... তাই বেনারস পর্ব শেষ করেই নবাব নগরীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। আজ সেই নবাবদের শহরের গল্পই শোনাই তবে।

ঐতিহাসিক এই নগরীর বর্তমান পরিচিতি উত্তরপ্রদেশের রাজধানী হিসেবে। নবাবদের রাজ্যপাট কবেই চুকে গেছে তবু সেই আমলের সংস্কৃতি আর তেহ্জিব এখনও শহরটার শিরায় শিরায় মিশে আছে। জনশ্রুতি বলে সেই রামায়ণের যুগে লক্ষ্মণ এই শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন। তাঁর নামেই শহরের নামকরণ হয়েছিল "লক্ষণাপুরি" (মতান্তরে লক্ষণাবতি)। সময়ের সাথে সাথে সেই নাম ক্রমে "লছ্মনপুর" হয়ে আজকের "লখনউ"! নিজের দীর্ঘ জীবনকালে এই শহর অনেক রাজা বাদশার শাসন দেখেছে... সে গজনীর মাহমুদ হোক বা মুঘল সম্রাট হুমায়ূন। তবে আজকের যে লখনউ কে আমরা চিনি তার সূত্রপাত হয় ১৭৩২ সালে, প্রথম নবাব সাদাত খানের হাত ধরে। তারপর, প্রায় ১৫০ বছর পর, অর্থাৎ ১৮৫৭র সিপাই বিদ্রোহের সময়, শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ কে ইংরেজরা "গৃহবন্দি" করে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে পাঠানোর সঙ্গেই সঙ্গেই নবাবি সাম্রাজ্যের ইতি হয়। সে হোক গে... ইতিহাস তার জায়গায় থাক... ওই নিয়ে অত কচকচির দরকার নেই। তার চেয়ে বরং ঘোরার গল্পটাই শোনাই। তবে ঐতিহাসিক জায়গা তো... মাঝে মাঝে ইতিহাস ঢুকেই পড়বে বৈকি!

ট্রেন থেকে চারবাগ স্টেশনে নেমে রওনা দিলাম গন্তব্য স্থলে। মানে আলিগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত আমাদের অফিসের হলিডে হোমে। পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেছিল তাই সেদিন আর ঘোরা হয়নি। তবে কাছেই "তুন্দে কেবাবির" একটা ব্রাঞ্চ ছিল। বুঝতেই পারছেন বেশ জমিয়ে পেট পুজো হয়েছিল! পরদিন সকালে আমাদের লখনউ ব্রাঞ্চ অফিসের ম্যানেজারের কাছ থেকে শহরের দর্শনীয় স্থানগুলোর ব্যাপারে জেনে নিয়ে সেইমত বেড়ানোর প্ল্যান করে নিলাম। প্ল্যান অনুযায়ী যেভাবে ঘুরেছিলাম সেভাবেই বর্ণনা করি।

১. রুমি দরওয়াজা - হলিডে হোম থেকে বেড়িয়ে অটো ধরে পৌঁছে গেলাম লখনউ শহরের "আইকন" রুমি দরওয়াজার সামনে। অটো থেকে নেমে একটা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লাম। নবাবি আমলের স্থাপত্য ঘোড়া গাড়ি চেপে দেখতে বেশ নস্টালজিক লাগছিল। তাছাড়া টাঙ্গাওয়ালা চাচা গাইডের কাজটাও বেশ করছিলেন। একদিকে টগ্ বগ্ শব্দে ঘোড়া চলেছে অন্যদিকে চাচার গল্প চলছে... ব্যাপারটা যাকে বলে জমে ক্ষীর একদম! 

Rumi darwaja, lucknow, tavel blogger, travel blog, bengali blog, indian history, historical place
রুমি দরওয়াজা

রুমি দরওয়াজা নির্মিত হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে, নবাব আসফ উদ্ দৌলার আমলে। ৬০ ফুট উঁচু এই দরজাটি শহর কনস্ট্যানটিনপেলের একটি দরজার অনুকরণে তৈরী হয়েছিল। নবাবি আমলে পুরানো লখনউ শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই দরজাটি।


২. বড়া ইমামবাড়া - রুমি দরওয়াজাকে পিছনে ফেলে আমাদের টাঙ্গা এগিয়ে চলল বড়া ইমামবাড়ার দিকে। আসফ উদ্ দৌলার আমলেই ১৭৮৫ থেকে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয় বিশাল এই স্থাপত্য। গেটে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। ইমামবাড়ার বিশালত্ব দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়! ভিতরে গাইড নিয়েছিলাম। আসলে এসব ঐতিহাসিক জায়গায় গাইড না নিলে অনেক গল্পই অজানা থেকে যায়। ইমামবাড়া ছাড়াও এখানে আছে আসফি মসজিদ, বাওলি বা স্টেপ ওয়েল এবং বিখ্যাত ভুল ভুলাইয়া। এছাড়াও এখানে নবাব আসফ উদ্ দৌলা এবং তাঁর স্ত্রী সামসুন্নিসা বেগমের সমাধী আছে। ইমামবাড়ার সুবিশাল সেন্ট্রাল হলটির (আমার মনে হয়েছিল আস্ত একটা ফুটবল মাঠ ধরে যাবে ওর ভেতরে!) বিশেষত্ব হল এখানে কোনওরকম খিলান বা পিলার দেখতে পাবেন না! ভাবুন তো অতবড় একটা স্থাপত্য অথচ একটাও পিলার নেই! 

Bara Imamabara, Lucknow, Indian History, Travel Blog, Historical Monument, Bengali Travel Blog, Bengali Travel Blogger, Travel Blogger
বড়া ইমামবাড়া

গাইড সাহেবের কাছে ইমামবাড়ার বিভিন্ন গল্প শুনতে শুনতে আর বাওলি দেখার পর আমরা পৌঁছে গেলাম বড়া ইমামবাড়ার আসল আকর্ষণ ভুল ভুলাইয়া তে! সে এক গোলকধাঁধা বটে! জনশ্রুতি বলে নবাবরা নাকি এখানে বেগমদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন। নবাবি খেয়াল তো... কতকিছুই না করতেন তাঁরা! তবে সঙ্গে গাইড না থাকলে এখানে রাস্তা গুলিয়ে ফেলাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর আমরা তো কেউ প্রদোষ মিত্তির নয় যে মগজাস্ত্র খাটিয়ে বেড়িয়ে আসব... তাই গাইড সাহেবের সাহায্য নিয়ে বেরিয়ে এলাম!

Bhul Bhulaiya, Bhool Bhoolaiya, Lucknow, Historical Monuments, Indian History, Travel Blogger, BengalibTravel Blog, Bengali Travel Blogger
ভুল ভুলাইয়ার গোলকধাঁধায়

৩. ছোটা ইমামবাড়া - বড়া ইমামবাড়া দেখে এগোলাম পরবর্তি গন্তব্য ছোটা ইমামবাড়ার দিকে। বড়া ইমামবাড়ার কাছেই অবস্থিত এই জায়গাটি। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে নবাব মহম্মদ আলি শাহের শাসনকালে নির্মিত হয় এই স্থাপত্য। ইমামবাড়ার মধ্যে দেখতে পাবেন মহম্মদ আলি শাহের তাজ বা মুকুট, তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের সমাধী, বেলজিয়ান কাঁচের ঝাড়বাতি ইত্যাদি। এছাড়াও ঘুরে দেখতে পারবেন নহবত খানা, ট্রেজারি বিল্ডিং ইত্যাদি।

Chota Imamabara, Lucknow, Historical Monument, Bengali Travel Blogger, Travel Blogger, Indian History, Bengali Travel Blog
ছোটা ইমামবাড়া

৩. হুসেইনাবাদ ক্লক টাওয়ার এবং আর্ট গ্যালারি - ছোটা ইমামবাড়া পর্ব সেরে চলে এলাম পরবর্তি দ্রষ্টব্য হুসেইনাবাদ ক্লক টাওয়ার দেখতে। এখানে আমাদের টাঙ্গাওয়ালাকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে গেলাম ক্লক টাওয়ারের দিকে। লন্ডনের বিগ বেনের অনুকরণে তৈরী এই ক্লক টাওয়ারের নির্মাণকাল ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ। প্রায় ২২০ ফুট উঁচু এই ক্লক টাওয়ার লখনউ শহরের অন্যতম আকর্ষণ। এখানে এলে অবশ্যই পাশের আর্ট গ্যালারিতে ঘুরে আসবেন। নবাবি আমলের অসাধারণ সব ছবির সংগ্রহশালা এই আর্ট গ্যালারি ঘুরে দেখতে ভালই লাগবে। গ্যালারি গেলে অবশ্যই গাইড নেবেন, নাহলে প্রতিটি ছবির বিশেষত্ব বুঝতে পারবেন না।

Husainabad Clock Tower, Lucknow, Indian History, Bengali Travel Blogger, Travel Blogger, Historical Monument,
ক্লক টাওয়ার

৪. রেসিডেন্সি - আর্ট গ্যালারি দেখে নিয়ে অটো ধরে চললাম পরবর্তী গন্তব্য কাইজারবাগ এলাকায় অবস্থিত রেসিডেন্সি। সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম সাক্ষী এই জায়গাটি। ১৮৫৭ সালে যখন বিদ্রোহের সময় বেগম হজরত মহলের নেতৃত্বে সেনাধ্যক্ষ বরকত আহমেদ বিদ্রোহী সেনাদের একজোট করে রেসিডেন্সি দখল অভিযান শুরু করলেন। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধ চলেছিল ১৮৫৭ সালের ৩০শে জুন থেকে ২৭শে নভেম্বর অব্দি। বহুদিন ধরে চলা এই যুদ্ধে শহীদ হন অগুনতি ভারতীয় সেপাই (সঠিক হিসেব আজ অব্দি পাওয়া যায়নি)। ইংরেজদের পক্ষ্যেও হতাহতের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। তৎকালীন রেসিডেন্ট জেনারেল স্যার হেনরি লরেন্স, মেজর জেনারেল জন ইংলিশ সহ অনেক ইংরেজ কর্তাব্যক্তিরা নিহত হন এই যুদ্ধে। কোম্পানির সৈনিক, সিভিলিয়ান এবং আধিকারিক সহ নিহতের সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫০০ তে। অবশেষে জেমস আউট্রামের (যার নামে কলকাতার আউট্রাম ঘাট) নেতৃত্বে রেসিডেন্সি দখল মুক্ত করা হয় ২৭ নভেম্বর ১৮৫৭ তে। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চিন্হ আজও দেখতে পাবেন রেসিডেন্সির ভিতরে অবস্থিত বিল্ডিংগুলোর গায়ে। প্রায় ৩৩ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছিল রেসিডেন্সি। নির্মাণকাল ১৭৭৫ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ। ভিতরে ঘুরে দেখে নিতে পারবেন বেইলি গেট, ট্রেজারী বিল্ডিং, ব্যাঙ্কয়েট হল, ডঃ ফায়রেরের বাড়ি, মূল রেসিডেন্সি বিল্ডিং, ১৮৫৭ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, বেগম কুঠি, ব্রিগেড মেস, ইমামবাড়া সহ বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত ইমারতগুলো। 

Bailey Gate, British Residency, Lucknow, Indian History, Bengali Travel Blogger, Travel Blogger, Bengali Travel Blog
বেইলি গেট

British Residency, Lucknow, Indian History, Bengali Travel Blogger, Bengali Travel Blog, Historical Monuments, Indian History, Travel Blogger
দেওয়ালে যুদ্ধের চিন্হ

British Residency, Lucknow, Indian History, Bengali Travel Blogger, Bengali Travel Blog, Historical Monuments, Travel Blogger
রেসিডেন্সির ধ্বংসাবশেষ

British Residency, Lucknow, Indian History, Bengali Travel Blogger, Bengali Travel Blog, Indian History, Travel Blogger, historical monuments
রেসিডেন্সি লেখা নামফলক

রেসিডেন্সি দেখা যখন শেষ হল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। পেটে তখন ছুঁচোয় ডন মারছে একেবারে। তাই আর এদিক ওদিক না করে চললাম সোজা আমিনাবাদ। উদ্দেশ্য পেটপূজো এবং অবশ্যই মার্কেটিং। আমিনাবাদ ছিল সেবারের লখনউ সফরের শেষ গন্তব্য। আর লখনউ এর খাওয়া দাওয়া নিয়ে লিখতে গেলে আলাদা একটা ব্লগ পোস্ট লিখতে হবে! ওখানকার গলৌটি কেবাব, পায়া নীহারি, মালাই কেবাব, শিরমল, লাচ্ছা পরোটা, আমিনাবাদ চত্বরের প্রকাশের কুলফি এবং অবশ্যই আওয়াধি ঘরানার বিরিয়ানি না খেলে নিজেকে মাফ করা সম্ভব হত না কোনোদিন! আর সেসব সুখাদ্যের ব্যাখ্যা কি আর এক দু লাইনে করা সম্ভব? তাই সে গল্প নাহয় আরেকদিন হবে। 

ঐতিহাসিক শহর লখনউ আমার বেশ কিন্তু লেগেছিল। নবাবদের স্মৃতি বিজড়িত দ্রষ্টব্য স্থান এবং আওয়াধি ঘরানার খাওয়া দাওয়া নিয়ে খাসা জায়গা। ইদানিং কলকাতায় আওয়াধি ঘরানার অনেক রেস্টুরেন্ট হয়েছে। তবে হলফ করে বলতে পারি লখনউ এর সেই স্বাদের ধরে কাছে যায় না তারা। বলতে পারেন শুধুমাত্র সেই স্বাদ পেতেই আবারও ঘুরে আসা যায় নবাবদের নগরী লখনউতে!

Monday, February 7, 2022

অচেনা বেনারসের খোঁজে



বেনারস.... ভারতবর্ষ তথা গোটা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এক শহর। আনুমানিক ৫০০০ বছর বা তার চেয়েও পুরানো এই শহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে কতো কাহিনী। কতো জানা অজানা ইতিহাস। আর সুপ্রাচীন এই নগরীর সঙ্গে বাঙালির যোগ কিন্তু বহু পুরোনো। পূণ্য ধাম কাশী বিশ্বনাথে পুজো দিতে যাননি এইরকম বাঙালির সংখ্যা বোধহয় হাতে গোনা। তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন সময়ে বেনারস বা কাশীর বিশেষ উল্লেখ শহরটাকে আপামোর বাঙালি জাতির বড় কাছের করে তুলেছে। আজ তবে সেই ঐতিহাসিক শহরের গল্পই হোক... তবে একটু অন্যভাবে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে একদিন অফিস থেকে ফিরে চা খাচ্ছি। টিভিতে বেনারসের গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যাআরতির ওপর একটি তথ্যচিত্র দেখাচ্ছিল। সহধর্মিণী মিতা হঠাৎ বলে উঠল "আজ অব্দি বেনারস যাওয়া হয়নি... একবার ঘুরে আসলে মন্দ হয়না"। সেবার বিশেষ কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। মনটাও কোথাও যাওয়ার জন্য উসখুস করছিল কদিন ধরেই। তাই সাত পাঁচ না ভেবে যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করে ট্রেনের টিকিট কেটে রওনা দিলাম। সেবার বিশ্বনাথ মন্দিরে পুজো দেওয়া, গঙ্গা আরতি দেখা, যন্তর মন্তর দেখা, রামনগর গিয়ে কাশীর রাজাদের প্রাসাদ দেখা, বিশ্বনাথ গলির রাবড়ি চেটে পুটে খাওয়া এবং বেনারসের বিখ্যাত পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা... এসব তো করেইছিলাম। এছাড়াও আরও কয়েকটি স্বল্পপরিচিত জায়গায় ঘুরেছিলাম। আজ বরঞ্চ সেবারে ঘুরে দেখা ৫টা স্বল্পপরিচিত জায়গার গল্পই শোনানো যাক। যাঁরা এইসব জায়গাগুলোর ব্যাপারে খুব একটা জানেন না তাঁদের কিছুটা পরিচিতি হয়ে যাবে। আর যাঁরা আগেই গিয়েছেন এইসব জায়গায় তাঁদের স্মৃতিচারণ হয়ে যাবে।

১. তিলভান্ডেশ্বর মন্দির - বাংলায় একটা প্রবাদ আছে "বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর"। প্রবাদটি এই স্থান বা বলা ভালো এই মন্দির সম্পর্কে খুব কার্যকরী। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তিলভান্ডেশ্বর মন্দির। ১৮ শতকে নির্মিত এই মন্দিরের পূজিত দেবতা মহাদেব। মন্দিরের নির্মাণকাল ১৮ শতক হলেও পূজারীর কথা অনুযায়ী শিব লিঙ্গটি স্বয়ম্ভু লিঙ্গ এবং প্রায় ২৫০০ বছরের পুরোনো। অর্থাৎ মন্দির প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই লিঙ্গটি পূজিত হয়ে আসছে এখানে। তবে আসল রহস্য কিন্তু এই শিব লিঙ্গটিকে ঘিরে কাহিনী নিয়ে! কথিত আছে প্রতি বছর লিঙ্গটি নাকি আকারে এক তিল করে বৃদ্ধি পায়! কিভাবে এই ঘটনা ঘটে তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা অবশ্য নেই.... তবে প্রতিবছরই এই ঘটনা অবশ্যই ঘটে। গল্পটি বিশ্বাস অবিশ্বাসের যার যার নিজের ওপর। তবে কোন পান্ডা না থাকায় বেশ শান্তিতে পুজো দিতে পেরেছিলাম এখানে।

tilbhandeswar temple, varanasi, travel, history

তিলভান্ডেশ্বর মহাদেব বিগ্রহ

২. সংকটমোচন মন্দির - নামেই বোঝা যাচ্ছে মন্দিরের আরাধ্য দেবতা হনুমান। বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে থেকে অটো ধরে পৌঁছে গেছিলাম সংকট মোচন মন্দিরে। হনুমানের একটি বিশাল বিগ্রহ আছে এখানে এবং ভক্তদের ভীড় লেগেই থাকে সবসময়। পুজো দিতে গেলে একটু সাবধান থাকতে হবে কারণ প্রচুর বাঁদর চারপাশে ঘুরে বেড়ায় সর্বক্ষণ! কথিত আছে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং তুলসিদাস! এখানেই তিনি হনুমানের দর্শন লাভ করেন এবং তাঁর বিখ্যাত কাব্য ' রামচরিত মানস ' রচনা করেন। 

sankatmochan temple, varanasi, history, travel

সংকটমোচন মন্দিরের বিগ্রহ

৩. কেদারেশ্বর মন্দির - প্রাচীন এই মন্দিরটি বেনারসের কেদার ঘাটে অবস্থিত। মন্দিরের শিব লিঙ্গটি কেদারনাথ মন্দিরের লিঙ্গের আদলেই তৈরী। যদিও কারও কারও মতে এই লিঙ্গটিও স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। মন্দিরটি এখানকার অন্যতম জনপ্রিয় মন্দির। ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র মনে হয়েছিল সময় যেন এখানে কোনও জাদুবলে থমকে দাঁড়িয়ে আছে! 

kedareshwar temple, varanasi, travel, history

কেদার ঘাটে কেদারেশ্বর মন্দির

৪. হরিশচন্দ্র ঘাট - বেনারস এসেছে অথচ মনিকর্ণিকা ঘাটের নাম শোনেননি এইরকম লোকের সংখ্যা হয়ত খুবই কম। কিন্তু হরিশচন্দ্র ঘাটের নাম খুব বেশি লোক বোধহয় জানেন না! অথচ স্থানীয় মতে বেনারসের অন্যতম প্রাচীন ঘাট গুলির মধ্যে একটি এই হরিশচন্দ্র ঘাট। মনিকর্ণিকার মতোই এখানেও শবদাহ করা হয়। মনে করা হয় পুরাণের বিখ্যাত রাজা হরিশচন্দ্র রাজত্ব পরিবার সব ত্যাগ করে এখানেই শবদাহের কাজ করতেন!

৫. সারনাথ - বেনারস থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত সারনাথ। এক সময়ের জগৎ বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ ছিল এই সারনাথ। বলা হয় এখান থেকেই প্রথম ভগবান বুদ্ধ ধর্ম শিক্ষা প্রদান করেন! এছাড়া বৌদ্ধ 'সংঘের' শুরুও এই সারনাথ থেকেই! আমাদের জাতীয় প্রতিক অশোক স্তম্ভ প্রথমে এখানেই রাখা ছিল। পড়ে সেটি দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখনও এখানে অশোক স্তম্ভের নীচের অংশটি স্বযত্নে রাখা আছে। বর্তমানে এই জায়গাটির রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব অর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ্ ইন্ডিয়ার হাতে। এখানে গেলে অবশ্যই পাশের মিউজিয়ামটি ঘুরে আসবেন। বহু অমুল্য প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন রাখা আছে এই মিউজিয়ামের মধ্যে।

dhameka stupa, sarnath, varanasi, travel, history

ধামেক স্তূপ


sarnath, varanasi, travel, history

পালি ভাষায় খোদাই করা বাণী


dhameka stupa, sarnath, travel, varanasi

বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ

সেবার হাতে সময় বেশি ছিল না। মাত্র ২ দিন ছিলাম বেনারসে। তবুও যতটা সম্ভব ঘুরেছিলাম। খুব ইচ্ছে ছিল বেনারসের বিখ্যাত গলি গুলো ঘুরে ঘুরে দেখব! এমনকি "জয় বাবা ফেলুনাথ" উপন্যাসের মগনলাল মেঘরাজের ডেরা সেই "কচৌড়ি গলির" সন্ধানেও যাবো। সময়ের অভাবে সেই গলি আর খোঁজা হয়ে ওঠেনি! আসলে এত অল্প সময়ের মধ্যে এইরকম ঐতিহাসিক একটা শহর পুরো ঘোরা হয়ে ওঠে না। তাই আবারও ফিরে যাব বেনারসে। অদেখা জায়গাগুলো ঘুরে দেখব। জানবো অনেক অজানা কাহিনী... অনুভব করবো ইতিহাস... সঞ্চয় করবো অনেক নতুন অভিজ্ঞতা!

ও হ্যাঁ.... সেবার বেনারস পর্ব শেষ করে পাড়ি দিয়েছিলাম নবাবদের শহর লখনৌ এর উদ্দেশ্যে। সেই গল্প নাহয় পরের বারের জন্য তোলা রইল।