Monday, April 10, 2023

একটু ভাজাভুজি, একটু অনিয়ম 😋


কলকাতার অনেক কিসিমে’র নাম আছে। সে কল্লোলিনী তিলোত্তমা থেকে শুরু করে নেহরুর বলা মিছিলনগরী... ইতিহাসের কিছুই এর না-দেখা নয়। কিন্তু আমি বলি আমার শহর খাদ্যনগরী। হ্যাঁ, হেন জায়গা নেই যেখানকার খাদ্যসম্ভার এখানে অমিল, আর কিছু কিছু ব্যাপারে তো কলকাতার জুড়ি মেলা ভার। আমি চিরকালই খেতে ভালোবাসি আর এই ভাজাভুজির দিকে ঝোঁকটা বেশিই। নোনতা স্বাদই জিভে ঠেকেছে, কি আর করা! কদিন ধরেই তাই ভাবছিলাম উত্তর কলকাতার দুয়েকটা নামজাদা ঐতিহ্যবাহী স্থান দর্শন করে আসার। সে আর হয়ে ওঠেনা, কিন্তু আজ মওকা পেয়ে দলবেঁধে গেলাম আস্বাদন গ্রহণ করতে। আজ আমাদের দল বেশ ভারীই ছিলো। আমি, Debanjan, Koushiki দি, ChiranJoy, Arijit Ghosh দা, Sudipta দা, Jayee দি.. সঙ্গে Snehasish এবং Anwesha অফিসফেরত সোজা যোগ দিলো। সঙ্গে পেয়ে গেলাম পথে যেতে যেতে Pial আর Roy বাবুকে, দুপুরে বলেছিলো হয়তোবা চলে আসতেও পারে!! তা যা ভাবা সেইমতন সবাইকে বলে দিয়েছিলাম নিরঞ্জন আগারের সামনেই সাক্ষাৎ করতে। 

আমাদের এতজনের জন্য তো আর চেয়ার-টেবিল খালি রেখে বসে থাকবেন না তাঁরা, অগত্যা বেশ খানিকটা অপেক্ষা করে বসার সুযোগ পেলাম বটে, কিন্তু বিধি বাম! ১৯২২ এ স্থাপিত এই বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় বিষ্যুদবার সেখানকার সিগনেচার আইটেম ডিমের ডেভিল হয়না!! কি করা যায়? কুছ পরোয়া নহী, বলা হলো ফাউল কাটলেট আনতে। সত্যিই দুর্দান্ত খেতে, মুচমুচে এবং সুস্বাদু। তারপর দোনোমোনো করে ডিমের চপ অর্ডার দিলাম, কিন্তু না!! ওটি ভালো লাগেনি একেবারেই, বেসনের আস্তরণে ডিম ঠিক জমলো না। একদিন অন্য বারে এসে ডেভিল গ্রহণ করতে হবে ভেবে দ্বিতীয় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। এইবার আমরা যাবো অ্যালেন কিচেন। 

১৯২৫ এর অ্যালেন কিচেনেও খানিকটা সময় অপেক্ষা করার পরে জায়গা পেলাম, কারণ একসঙ্গে এতজনকে স্থান সঙ্কুলান করাটাও মুশকিল কিনা! খুব বেশিক্ষণ নয় অবশ্য, অর্ডার দেওয়া হয়েছিল এখানকার বিখ্যাত পদ চিংড়ির কাটলেট। উলস্!! ঘিয়ে ভাজা চিংড়ির এই কাটলেট স্রেফ চমৎকার বললেও বিবরণ দেওয়া যায়না মশাই, গিয়ে খেয়ে আসতে হবে। যাক, ডিমের চপের দুঃখ অচিরেই ভুলতে পারছিলাম বৈকি। ততক্ষণে আবার টিপটিপ দুফোঁটা গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যা-ই হোক, দুয়েক ঢোঁক ঠাণ্ডা পানীয়ে চুমুক দিয়ে এইবার আজকের তৃতীয় তথা শেষ গন্তব্য, মণি রেস্তোরাঁ।

পটলার কচুরির অদূরেই এই ছোট্ট আস্তানাটি আজকের অভাবনীয় হিরো/হিরোইন/সেন্ট্রাল ক্যারেক্টর। এমন সুস্বাদু মাছের কচুরি, তাও মাত্র ১০/-(দশ) টাকায়, সত্যি বলছি ভাবতেই পারিনি। বলরাম বাবুর নাম, কারিগরী মাধুর্য আমি শুনেই ছিলাম সুদীপ্ত দার কাছে, আজ একেবারে হৃদয়ে পশিয়া গেলো। ফাউল কাটলেট যদি হয় শেহওয়াগের ভয়ডরহীন ব্যাটিং, ডিমের চপ একেবারে সদাগোপান রমেশ। চিংড়ির কাটলেট ধ্রুপদী রাহুল দ্রাবিড় আর মণি রেস্তোরাঁর মাছের কচুরি? আমার মতে আনসাং হিরো ভিভিএস লক্ষ্মণ। তারপর অবশ্য মিষ্টিমুখের পালা, বড়ো ভালো কাঁচা আমের স্বাদের সন্দেশ টুকটুক করে খান দুয়েক পেটে পুরে মধুরেণসমাপয়েৎ হলো। আজ এতজন একসাথে মিলে হইহই করে সন্ধ্যাটা বড়ো সুন্দর কাটলো। 

আবার একদিন হবে, শীতের সন্ধ্যায়। ফেরার পথে এইসব আলোচনা করতে করতেই দক্ষিণের বৃষ্টি গায়ে মেখে বাড়িতে। এ এক দারুণ আনন্দের ব্যাপার বটে। 😍

Monday, January 23, 2023

কোরিয়ান ফুড ট্যুরের ইতিউতি

খাদ্য সফরের কোরিয়ান পর্ব/কোরিয়ান ফুড ট্যুর। 

মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই, থাকার কথাও নয়। নিত্যনতুন পরিভাষা যে কোনো বিষয়েরই হোক না কেন, একটা আগ্রহ জাগলেই সেটা নিবৃত্ত করার জন্য সচেষ্ট হয় তারা। আমাদের কয়েকজনের আগ্রহ খাবারদাবার নিয়ে, হ্যাঁ, চর্ব্যচোষ্য লেহ্যপেয়র মধ্যে যা অজানা, অচেনা, স্বাদ পাওয়া হয়নি, সেটা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাতে পিছপা হইনা। 

ইদানীং দক্ষিণ কোরিয়ার বেশকিছু বিষয় আমাদের চারদিকে জনপ্রিয় হয়েছে। তার মধ্যে যেমন সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা কোরিয়ান পপসঙ্গীত আছে, তেমনই আছে কোরিয়ান খাদ্যসম্ভার। তা, কলকাতায় খুব সম্প্রতি কিছু খাদ্য স্থান খুলেছে এই দেশের খাবার নিয়ে, তারই মধ্যে একটি হলো King's Bakery.. এখনো পর্যন্ত চারটি শাখা আছে যার মধ্যে তিনটি (পূর্ণদাস রোড, বালিগঞ্জ এবং যোধপুর পার্ক) দক্ষিণ কলকাতায়, আরেকটি রাজারহাটে। কয়েকদিন আগেই আমার সাথে কয়েকজন খাদ্যরসিক বন্ধুবান্ধবদের আলোচনা হচ্ছিলো একবার সেখানের একটি শাখায় যাওয়াটা কর্তব্য। তা যে ভাবনা আসে, সেটা ফলপ্রসূ করতে গেলে যা যা করণীয়, তা করা হলো। প্রিয়াঙ্কা পূর্ণদাস রোডে খোঁজ নিয়ে আমাকে জানানোর পরে আমরা স্থির করলাম আজকের দিন, অর্থাৎ ২২শে জানুয়ারী একবার গিয়ে একটু চেখে আসা যাক এই দেশের কুইসিন। 

কোরিয়ার খাবারের মূল উপাদান চাল। হুম, এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের মতই সেখানে চালের বিভিন্ন প্রকারভেদের রূপদান পায় খাদ্যের মধ্যে। সাথে থাকে মাছ, মাংস, এবং বিভিন্নরকম সবজির সম্ভার। রান্নায় কিছু পরিমাণ সয়াসস আর কালো বীনের সস ব্যবহৃত হয় খোলতাই স্বাদের জন্য। ভাতের ধরণ খানিকটা আঠালো, নরম চালের। কোরিয়ার মিষ্টি কিম্বা ডেসার্ট পদেরও বেশ সুনাম আছে দেখলাম। সে কথায় আসছি পরে। 

কথা অনুযায়ী আমরা কজন, অর্থাৎ কৌশিকী দি, প্রিয়াঙ্কা, চিরঞ্জয়, চিরঞ্জয়ের স্ত্রী রিম্পা, ছোট্ট রিয়ান, বন্ধু সুরিত, সুদীপ্ত দা এবং আজকের চমক, অলস ঘরকুনো চমৎকার রন্ধনশিল্পী বিপ্লব দা এবং এই শর্মা!! বিপ্লব দা আজকের সফরে সঙ্গী হতে চেয়েছে এ এক দারুণ আশ্চর্যের ব্যাপার। নিজে ভালো রাঁধে বলেই নয়, এই ভদ্রলোক অফিস ছাড়া কোথাও যেতে একেবারেই চায়না। সে ভালো কথা, মোটামুটি সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা পৌঁছালাম ওখানে। সুন্দর সাজসজ্জা, আসবাবপত্র এবং কর্মচারীদের ব্যবহার, ভালো লাগলো। শীত তো কলকাতার মায়া প্রায় ত্যাগ করেইছে, তা আর কি করা যাবে? মেন্যু দেখেশুনে ঠিক করা গেলো অর্ডার দেওয়া হবে নানারকম পদ, যাতে বৈচিত্র্য আর স্বাদের ধরণ পরখ করা যায় ঠিকঠাক। 
তাই, 

১) 𝙏𝙪𝙣𝙖 𝙂𝙞𝙢𝙗𝙖𝙥 (চালের সঙ্গে টুনা, গাজর, শশা, বাঁধাকপি ইত্যাদি সবজির মিশ্রণের চাকতি, মোড়কটা সামুদ্রিক শৈবালের চাদরের, যাকে বলে gim).. কালো বীনের সস সহযোগে খেতে মন্দ নয়। 

২) 𝙆𝙞𝙢𝙘𝙝𝙞 𝙂𝙞𝙢𝙗𝙖𝙥 (একইরকম, শুধু টুনার বদলে কাঁকড়ার মাংস থাকে)।

৩) 𝙆𝙞𝙢𝙘𝙝𝙞 𝙁𝙧𝙞𝙚𝙙 𝙍𝙞𝙘𝙚 (কিমচি ব্যাপারটা হলো কোরিয়ার প্রথাগত একটি পদ, যাতে নাপা বাঁধাকপি, কোরিয়ান মুলো, গাজর ইত্যাদি কে গাঁজন করে ব্যবহার করা হয় রান্নায়)। বেশ ভালো লেগেছে। 

৪) 𝙏𝙩𝙚𝙤𝙠–𝙗𝙤𝙠𝙠𝙞 (চালের তৈরি এক ধরনের পিঠে যা সিদ্ধ মাছ, ডিমের সাদা অংশ এবং কিছু সবজির অংশ, যেমন পেয়াঁজকলি দিয়ে বানানো হয়, গাঢ় ঝোলের মধ্যে ), এটির স্বাদ মিষ্টি খানিকটা। 

৫) 𝙅𝙖𝙮𝙪𝙠 𝘿𝙚𝙤𝙥𝙗𝙖𝙥 (যারা পর্কপ্রেমিক, তাদের জন্যে চমৎকার একটা পদ, খুব সহজ, শুয়োরের মাংসের কারি, আর ভাত), ঝালমিষ্টির সাযুজ্য রয়েছে, সুস্বাদু। 

৬) 𝙍𝙖𝙢𝙮𝙚𝙤𝙣 (এগ চিকেন স্পাইসি বলা হয়েছিল যাতে একটু ঝালঝাল কিছু একটা হয়.. নাহ্, সে হয়নি, নুডলস হিসেবে সাধারণ স্বাদের)।

এসবের পরে এলো ডেসার্টের পালা। এখানে এটির সম্ভার বেশ ভালো, আমরা নিয়েছিলাম 𝘾𝙖𝙧𝙧𝙤𝙩 𝘾𝙝𝙚𝙚𝙨𝙚 𝘾𝙖𝙠𝙚, 𝙀𝙜𝙜 𝙏𝙖𝙧𝙩 এবং 𝘾𝙧𝙚𝙖𝙢 𝘾𝙝𝙤𝙪𝙭 (ক্রীম ভরা ছোট ছোট বান).. আর আমি তো কোনো জায়গায় চা পেলে চাখতে ছাড়িনা, তাই 𝙎𝙪𝙟𝙚𝙤𝙣𝙜𝙜𝙬𝙖(𝘾𝙞𝙣𝙣𝙖𝙢𝙤𝙣 𝙋𝙪𝙣𝙘𝙝)চেখে দেখলাম বিপ্লব দার সাথে। সে এক দারুণ অদ্ভুৎ বটে, তা দারুচিনি আর কেমনই বা হবে?? 

সব মিলিয়ে আড্ডা, গল্প, নতুন ধরনের খাবার.. একটা ভালো সন্ধ্যা কাটলো। হ্যাঁ, পেটের জন্য বন্ধুমনোভাবপন্ন খাবার, আমার বেশ ভালোই লেগেছে। আবারও কখনো আসা হবে বৈকি, কারণ আজ অনেকেই বিভিন্ন কারণে আসতে পারলোনা। ততক্ষণ, ভালো খাবারের কথা ভেবে মন ভালো করা যাবে। পরিশেষে, যার কথা না বললেই নয়, সে হলো রিয়ান। পুরোটা সময় একবারও অধৈর্য্য বোধ করেনি, বেচারা বড়দের খাবারদাবার খেতেও পারেনি, মিষ্টি জাতীয় ওয়্যাফল আর টার্ট খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে, কিন্তু রীতিমতো এনার্জি নিয়ে সঙ্গ দিয়েছে সব্বাইকে। বড়ো হলে অবশ্য ওকে নিয়ে খেতেটেতে বেরোবো, হি ইজ আ সুইটহার্ট।😃❤️


Friday, September 30, 2022

অথ কচুরি কাহিনী


ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারার পরে প্রাতঃরাশ, এই দিয়েই দিনের শুরু হয়, আর ইংরেজিতে একটা প্রবাদই আছে morning shows the day. আজকাল তো এই জলখাবারের নানান ধরণ এসেছে, সারা বিশ্বের খাদ্যাখাদ্য ডাইনিং টেবিলে শোভা পায়। তার উপর রয়েছে ডায়েটিংয়ের বাঁশি। তা সে যা-ই হোক না কেন, ভোরবেলার ঝলমলে রোদ আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে যায় কি দেখে? আরকিছুই নয়, কড়াইয়ে ঘি অথবা ডালডায় ভাজা সোনালী লালচে গোলাকার বস্তু দেখে; যার নাম কচুরি।

অরিজিৎ ঘোষ দার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিলো সকালবেলায় বিভিন্ন জায়গায়, তা সে উত্তর হোক বা দক্ষিণ কলকাতায়, কচুরি খাবে। একাজে সেকাজে সেটা কিছুদিন পিছিয়ে গেলেও মাথায় ছিলো বৈকি৷ কিন্তু, আমাদের জীবনের আরেকটি অঙ্গ তো আলস্য, সেটা ঠেকিয়ে এতো সকালে ছুটোছুটি করাও তো কঠিন। তাই, প্রায় চার মাস পরে আজ আমরা ক'জন বেরিয়ে পড়েছিলাম এই শুভকাজ সম্পন্ন করতে। রায় বাবু সামান্য অসুস্থ থাকায় যোগ দিতে পারেনি। তাই, আমাদের দেবাঞ্জন, সুদীপ্ত সাহা দা, অরিজিৎ ঘোষ দা আর এই অধম বেরিয়ে পড়লাম কচুরি অভিযানে। 

শুরুটা করলাম হরিশ মুখার্জি রোডের বিখ্যাত বলবন্ত সিংয়ের ধাবায়। অতিপরিচিত এই খাদ্যালয়ে হিংয়ের কচুরি আর আলুর তরকারি, কাঁচালঙ্কার আচার সহযোগে, কার না ভালো লাগে? এক প্লেটে চারটি গরমাগরম কচুরি, তারপর ভাঁড়ে গরম চা, মেজাজ খুশ হয়ে গেলো যাকে বলে! কিন্তু, সাথে আরেকটি কথাও আলোচনা করে নিলাম যে এরপরে তো আরো দুয়েকটা জায়গায় যেতে হবে, তাই ভাগযোগ করে খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

Balwantsinghdhaba, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর ট্যাক্সি ছুটলো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের আদি হরিদাস মোদকের দিকে। এটিও সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত পরিচিত বটে। প্রায় ২৫০ বছর ধরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এই স্থানের ব্যতিক্রমী চেহারা হলো পরিবেশনের ধরণে, কলাপাতায়। সেখানে পাওয়া গেলো কচুরি, এবং ছোলার ডালের তরকারি। বেশ সুস্বাদু, চটজলদি জায়গা পাওয়া যায়না সেটাই স্বাভাবিক। এখানে মোটামুটি খান তিনেক কচুরি গলাধঃকরণ করে ধীরেসুস্থে জলপানের পরে একটি সিগারেট ধরালাম।  

HaridasModak, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

উত্তর কলকাতায় এসে একটু গঙ্গা দর্শন না করলে কি হয়? তাই, পদব্রজে টুকটুক করে এগোলাম বাগবাজার মায়ের ঘাটের দিকে। সেখানে গঙ্গা পাড়ে বসে খানিকক্ষণ হাওয়া খেয়ে যাবো পটলার কচুরির পানে। পটলার কচুরি...... বাগবাজার গিয়েছেন অথচ এখানে ঢুঁ মারেননি এরকম লোক কে জানে আছে কিনা! ৯৩ নট আউট, স্টেডি ফুটস্টেপ, এবং অসাধারণ লাইন ধরে ড্রাইভ করে চলেছে। আহা, শীতকালের দোরগোড়ায় এসে একটু ক্রিকেটের উপমা দেওয়াই যায়, কি বলেন? এখানে কচুরির সাথে তরকারির স্বাদে আরেকটু প্রচলিত ধরনের ছোঁয়া পেলাম। ততক্ষণে পেট বেশ ভরেছে, এবং মন তো অবশ্যই। 

PotlarKochuri, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

কিন্তু, সব ভালো যার শেষ, তাই না? তা এদিকে এসে পুঁটিরাম হবেনা? না না, আমরা তেমনটা ঠিক নই। অতএব, করলে স্কোয়ারে অল্পসময় জিরিয়ে নিয়ে শেষ আখড়া কলেজ স্ট্রিটের পুঁটিরাম। সেখানে অবশ্য আরেকটু যোগ হলো কচুরির সঙ্গে টকদই, আর রসমালাই। আমাদের সুদীপ্ত দার একটু মিষ্টিমুখ না করলে কেমন খালিখালি লাগে কিনা! 

PutiramSweets, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

মন ভালো লাগে, চারপাশ কেমন যেন বদলে যায় সুখাদ্য গ্রহণের পরে। অতএব, এদিকের পাট চুকিয়ে আমরা গেলাম ধর্মতলায়। মশাই, ৪০/- টাকায় সেই লস্যি, উফফ!! খোয়াক্ষীর, কাজু, কিশমিশ, চেরি দিয়ে সুসজ্জিত। এটা এক গ্লাস খেলেই তো পেট ভরে যায়! 

Lassi, kolkatastreetfood, foodblogger, foodblog, kolkata, bengaliblogger

অতঃপর, বিদায় নেওয়ার পালা, কিন্তু আজ প্রাতঃরাশের জন্যে এই ছোট্ট সফর মনে থাকবে, অনেকদিন পরে সকালে ঘোরাঘুরি হলো, আর আমাদের খাদ্যসফরও আরেকটি ভোরেই শুরু হয়েছিল। পরেরবার অবশ্যই অন্যরকম আনন্দময় এক অধ্যায় নিয়ে আসবো এই-ই আশা। আপাতত, পুজো সব্বার ভালো কাটুক। ☺️

Saturday, August 27, 2022

মেট্রো চরিত


মেট্রো রেল কলকাতার অন্যতম গর্ব। ব্যস্ত অফিস্টাইমে যানজটহীন সওয়ারি হিসেবে মেট্রোর বিকল্প বোধহয় খুব কমই আছে। সেই ১৯৮৪তে পথ চলা শুরু করার পর থেকেই "পাতাল রেল" (তৎকালীন) খানিকটা "বোরোলিনের" মতোই (বঙ্গ জীবনের অঙ্গ) কলকাতা জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে পরিসর বেড়েছে মেট্রো রেলের। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানুষের ভিড়। আজকাল অফিস টাইমে খানিকটা লোকাল ট্রেনের মতোই গুঁতোগুঁতি ধাক্কাধাক্কি হওয়াটা জলভাত ব্যাপার হয়ে গেছে মেট্রো যাত্রীদের কাছে। তবে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়... তাই এটুকু সমস্যা মেনে নেওয়াই যায় আরকি!

রোজ কতশত মানুষ মেট্রোতে নিজের গন্তব্যে পাড়ি দেন। একটু লক্ষ্য করলেই এইসব মানুষের মধ্যেই প্রচুর মজার উপাদান পেয়ে যেতে পারেন! চলুন... আজ বরঞ্চ এইরকমই কিছু মানুষকে নিয়ে হালকা মজার আলোচনা করা যাক! 😀

১. দৌড়বিদ - প্রথমেই এঁদের কথা না বললেই নয়! এঁদের সবসময় খুব তাড়া! ধরুন প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে... এস্কেলেটরে জম্পেশ ভিড়... সবাই আগত ট্রেনটি ধরবে.... এমন সময় এই দৌড়বিদরা হটাৎ জেগে ওঠেন! পাক্কা প্রফেশনাল ফুটবলারদের মতো সামনের ভিড় খানিক গুঁতিয়ে, খানিক ডজ্ করে এঁরা মেট্রো ধরতে অগ্রসর হন! তবে পাশের সিঁড়ি খালি থাকলেও এঁরা নিজেদের "স্কিল" ভুলেও সিঁড়িতে দেখান না... ওখানে বড্ড খাটুনি যে! 😁 

এছাড়াও বাড়ি ফেরার সময়তেও এঁদের তাড়া দেখবার মতো! মেট্রোর গেট থেকে প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই যেভাবে দৌড় শুরু করেন তাতে উসেইন বোল্ট লজ্জায় পড়ে যাবেন! যেন গেট থেকে আগে বের হলেই মেট্রো কর্তৃপক্ষ পুরস্কৃত করবেন! 😆

২. নট সো সিনিয়র সিটিজেন - যাঁরা মেট্রোতে যাতায়াত করেন তাঁরা সবাই সিনিয়র সিটিজেন সিট সম্বন্ধে অবগত। এই বিশেষ সিট খালি থাকলে কম বেশী সবাই বসে যাই এখানে। আবার বয়স্ক কেউ উঠলে বেশিরভাগ লোকজনই সিট ছেড়ে দেন। কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায় আছেন যাঁরা সিট ছাড়তে অপরাগ! কোনও বয়স্ক যাত্রী এঁদের সিট ছেড়ে দিতে বললে এমন ভাবে তাকান যেন সিট নয় কিডনি চেয়ে ফেলেছে! 😆 অনেকেই আবার তক্ষুনি প্রচণ্ড ঘুমিয়ে পড়েন! এক দুবার ডাকলেও উঠতে চান না। অবশ্য সহযাত্রীদের হস্তক্ষেপে শেষমেষ সিট ছাড়তে বাধ্য হন।

৩. মরাল পুলিশ - এঁদের আবার সমাজের অবক্ষয় নিয়ে দারুণ চিন্তা! বিশেষত ট্রেনে কোনও প্রেমিক যুগল উঠলেই এঁরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন! তাঁদের সময় কি ছিল আর বর্তমানে সমাজের কি হাল এটাই মূলত এঁদের আলোচনার বিষয়! এমনিতে আলোচনা অবধি ঠিক আছে কিন্তু কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লে গোল বাঁধে তখন! 🙁

৪. ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায় - অফিস টাইমে আজকাল ভিড় ব্যাপারটা জলভাত হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এত ভিড় হয়ে যায় যে ঠিকমতো দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়ে। হালকা ধাক্কাধাক্কি চলতেই থাকে যার বেশিরভাগটাই অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা ওই যাকে বলে "ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়"! এঁরা অনেকটা মোবাইলের টাচ স্ক্রিনের মত! অল্প টাচ লাগলো কি দপ করে জ্বলে উঠল! নিজেরাও যে ভিড়ের মধ্যে অন্যকে ধাক্কা দিচ্ছেন সেই ধারণা অবশ্য এঁদের মগজে ঢোকানো দুষ্কর! 😆

৫. বই পোকা - এঁরা একটু ধির স্থির প্রকৃতির। চুপ চাপ মেট্রোয় উঠে একটা অপেক্ষাকৃত খালি জায়গা খুঁজে প্রথমেই দাঁড়িয়ে পড়েন। বসার জায়গা মিললে তো কথাই নেই! একটু পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে ব্যাগ থেকে বই বের করে সোজা তার মধ্যেই ডুবে যান। তারপর দুনিয়া গোল্লায় যাক... বই পড়ায় প্রভাব পরে না! শুধু মাঝে মাঝে মুখ উঠিয়ে দেখে নেন গন্তব্য এসে গেল কিনা। ও হ্যাঁ... আমিও নিজেও কিন্তু এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত! 😆

এছাড়াও আরো কত ধরণের মানুষ দেখতে পাবেন। কেউ খালি সিট দেখেও বসতে চান না। সহযাত্রীরা খালি সিট দেখিয়ে দিলেও সামান্য হেসে অথবা মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দেন তিনি দাঁড়িয়েই খুশি! কেউ আবার আপাতদৃষ্টিতে ভর্তি সিটের মধ্যেও বসার জায়গা খুঁজে নেন! সিটের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমত "হেড" কাউন্ট করে বসার জায়গা বের করে নেন! কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করেন তো কেউ নিত্য দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও খেলাধুলো, অফিসের চাপ এইসব নিয়ে আলোচনা বাকবিতণ্ডা তো লেগেই থাকে। আসলে... আমরা সবাই... হয়ত নিজেদের অজান্তেই এইসব চরিত্রগুলির অংশ হয়ে যাই। তাই এই লেখাটি কাউকে ছোট করার জন্য নয়। শুধুমাত্র রোজকার ব্যস্ত জীবনযাত্রার মাঝে মজার কিছু মুহূর্ত তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই লেখা। আশাকরি ভাল লাগবে। 😀

Saturday, August 20, 2022

"খাদ্য সফরের দিশি কাহিনী"

#যারা_বৃষ্টিতে_ভিজেছিলাম, তারা ফুড ট্যুরটাও করেছিলাম। 

আষাঢ় শ্রাবণ পেরিয়ে ঋতুচক্র ভাদ্রে পা দিয়েছে, শহরটাকে সঙ্গে নিয়ে দিব্যি খেলছে কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদের মধ্যে। ঘর্মাক্ত হচ্ছি, আর দিনে দশবার করে বিরক্ত হচ্ছি, কখনো ভিজে, কখনো বা চাঁদি তাতিয়ে। সে যাকগে, অমন তো কতোই হয়!! তাই বলে কাজকর্ম করবো না? এ কি মানা যায় অ্যাঁ? না না, কাজ বলতে এদিকসেদিক পেটপুজো, বুঝলেন না? 

চীনে, পার্শী, আরবি, মুঘলাই ইত্যাদি ইত্যাদি হওয়ার পরে বন্ধু দেবাঞ্জন অনেকদিন ধরেই বলছিলো একবার আমাদের কলকাতার নিজস্ব ব্যাপার পাইস হোটেলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে! আমি মোটামুটি লেক মার্কেটের তরুণ নিকেতন বা নিউ মার্কেটে সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম, বা কলেজ স্ট্রিটের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলের তল্লাটে ঢুঁ মারলেও ও কখনো এই পরিবেশে খায়নি। তাই আমরা ক'জন ঠিক করেছিলাম একবার চিরপরিচিত বইপাড়ায় ঘুরে আসবো, আর একবার নাহয় ডানহাতের ব্যাপারটাও সেরে নেওয়া যাবে। অতঃপর, কথাবার্তা, আলোচনা, সময়, এবং দেখাসাক্ষাৎ করার স্থান নির্বাচন করে বেরিয়ে পড়লাম খাদ্য সফরের এই পর্যায়ে, যা কিনা অচিরেই বদলে যাবে বাঙালি থেকে মিশ্রিত চেহারায়। আহা, আনপ্রেডিক্টেবল না হলে জীবন কেমন বিশ্রী চায়ের মতো ঠেকে না?

আমি আর দেবাঞ্জন আসার পথে ঠিক করলাম প্রথমেই কি আর পাইস হোটেলে যাওয়াটা ভালো দেখাবে? মানে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের সময় না গিয়ে অবেলায়.. একবার অতি প্রিয় "গুঞ্জন" যেখানে হাতছানি দেয়, সেখানে যাবোনা? না না, এতটাও কঠিনহৃদয় নইকো। বাকিদের সেরকমই বলে দেবো স্থির করে গেলাম আমরা কলেজ স্কোয়ারের পথ ধরে ভিজতে ভিজতে। হ্যাঁ হ্যাঁ, অমন বৃষ্টি ঢের ঢের দেখেছি, ভয় দেখিয়ে লাভ নেই!! ছোট্ট, কিন্তু মনোরম, এই হলো সংক্ষেপে গুঞ্জন, আমরা এক এক করে জড়ো হলাম। খাদ্যরসিক হওয়ার একটা প্রাথমিক নিয়ম আছে, তা হলো মনের জানালা দরজা খুলে রাখা! হুম, তা-ই এলো নিজের ছন্দে মন ভালো করা রোস্টেড চিলি পর্ক, চিলি চিকেন, এবং চিলি প্রণ। সবই ড্রাই, কারণ মুখোরোচক পদ যা কিনা খাদ্যের সূচনা করবে, বেশি রসসিক্ত না হওয়াই ভালো, মনের এবং উদরের রসেই জারিত করা যাবে খন। প্রতিটি পদ সুন্দর, সহজ, এবং সুস্বাদু। পর্কের লীন মীট আর ফ্যাট সুষমভাবে বন্টিত, স্রেফ লঙ্কা ক্যাপসিকাম, এবং পেঁয়াজের সান্নিধ্যে পরিচিত মাংস, চিংড়ি সবারই পছন্দ হলো। বেশ ঠান্ডা হাওয়ায় ততক্ষণে চারদিক ভালোই লাগছে। 

Gunjancollegestreet, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove

Gunjancollegestreet, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove

আজ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে কলেজ স্ট্রিটের ৭২.৩৪% দোকান বন্ধ। তারই মধ্যে বইচই, বইবন্ধুর মতো কিছু জায়গায় ভালো কিছু সন্ধান পেলাম। নাহ্, নিইনি, পরেরবারের জন্য রেখে এইচি। ধূমপান, চা পান ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে এক চক্কর গেলাম কলেজ স্কোয়ারের গন্ডিতে। ঘড়ির কাঁটা তখন তলব করেছে মাথাকে, ওহে!! এবার চলো। সদলবলে উপস্থিত হলাম ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া এই পাইস হোটেল সাক্ষী একমেবাদ্বিতীয়ম সুভাষ বসুর আগমনের, যার হাতে গড়া সেই মনগোবিন্দ পন্ডার সৃষ্টি আজ কালক্রমে মহীরুহে পরিণত। যা-ই হোক, দুপুরবেলা, ছুটির দিন হলেই ভিড় যথেষ্ট। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে সবারই স্থান সঙ্কুলান হলো বটে। আমরা একে একে নিজেদের পছন্দের পদ বললাম। কেউ খাসির মাংস, কেউ বা ইলিশ, আবার জাভেদ খেলো পারশে। সাথে ঘন মুগের ডাল, পুঁইশাকের চচ্চড়ি, আর আমের চাটনি, পাঁপড়। সহজ, এবং সুস্বাদু। বিশেষত চচ্চড়িতে ঠোঁট থেকে জিভ ছুঁতেই টপ করে এক বিন্দু অশ্রুজল নিঃসৃত হলো, সুখানুভব আরকি...! তরিবত করে ডানহাতের ব্যাপার সমাপন করে এলাম মোড়ে, মিঠেপান না হলে মধুরেণসমাপয়েৎ কেন বলেছে মশাই?? 

SwadhinBharatHinduHotel, kolkatastreetfood, foodblogger, foodlover, foodlove



তারপর? বাড়ি ফিরে যাওয়া? আরে রোসুন, এতো তাড়া কিসের? একপাক নাহয় ঘুরেই যাই ধরমতল্লার মুলুকে। দুটো ট্যাক্সি, সাঁইসাঁই করে সোজা জিপিও ক্যাফে!! আমাদের জেনারেল পোস্ট আপিসের এই ব্যাপারটা শুনেছিলাম বন্ধু সপ্তর্ষির কাছে। মতলবটা ছিলো একদিন আসা যাবে, তা আজই কেন নয়? গেলুম, কিন্তু সত্যি বলতে কি, খাদ্যপানীয়াদি বড়োই অপ্রতুল... পরিবেশ চমৎকার বটে, ডাকটিকিট ও অ্যান্টিক সামগ্রীর আর্টিফ্যাক্ট দেওয়াল সুসজ্জিত করেছে, আর Ionic–Corinthian স্থাপত্যের নিদর্শন তো আছেই। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত করে চা পান সেরে বিদায় নেওয়ার পালা। 

ফেরার পথে আমরা আবার বাড়ির কাছে রাধুবাবুর ওখানে গিয়েছিলাম, ফিনিশিং টাচের জন্য। না না, ঐ দুটো ফ্রাই, দুটো কাটলেট, একটু চা, এই আরকি। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে একটু শরীরে তাগত আনবো না, কি বলেন? 

muttonkabiraji, kolkatastreetfood, kolkatadiary, foodblogger, foodlover, foodlove, Radhubaburdokan

আজকের সফরে বেজায় মিস করেছি কিছু সঙ্গীকে৷ তবে, পরেরবার, সে এক দারুণ আনন্দের ব্যাপার হবে এ-ই আশাতেই রইলাম। আজ আসি, কেমন?




Thursday, May 19, 2022

মরু দেশের টুকিটাকি (খাদ্য সফরের পঞ্চপল্লব )


"ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন, চরণতলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন..."

 বিশ্বকবি তাঁর দিগন্তবিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে লিখলেও আমার জন্য সেটা এসে ঠেকেছে রসনায়। মানে, এই মুঘলাই, আরবীয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস এবং প্রচলিত, খ্যাত, আবার একান্ত নিজস্ব যে পদের বিভিন্নতা, আগ্রহ তো জাগেই, তাই না? 

কিছুকাল আগে শুনলাম আমাদের শহরে রেস্তোরাঁ হয়েছে যেখানে একেবারে মরু দেশের কায়দায়, সজ্জিত সান্নিধ্যে আপ্যায়ন করা হচ্ছে! বেশ ভালো, তখনই স্থির করে ফেলা গেলো একবার সচক্ষে দর্শন, এবং আহারাদি সম্পন্ন করে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করে আসতে হবে। তাই, আমার বন্ধুবান্ধব, খাদ্যরসিক, যারা পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রে পিছপা নয়, সবাই মিলে হাজির হলাম পার্ক সার্কাসের "বার্কাস" রেস্তোরাঁয়। 


আমরা যখন উপস্থিত হলাম, একে একে দুয়ে দুয়ে, রেস্তোরাঁ প্রায় পূর্ণ, কারণ সহজ, আজ রবিবাসরীয় তিথিতে কে-ই বা ঘরের কোণে থাকতে চায়? রেস্তোরাঁ সুসজ্জিত, সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো "দরবার", সুন্দর মখমলি গদী বিছানো, ও তাকিয়া রাখা, কাষ্ঠনির্মিত মেজ, যেখানে খাদ্যপানীয় বাসনাদি রেখে খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। আমরা ঠিক করেছিলাম, বলা ভালো প্রধান কারণ এখানে আসার, "লাহাম মান্ডি", যা কিনা বিরিয়ানির একটি আরবীয় সংস্করণ, সেটা চেখে দেখতে হবে। এছাড়া, শেষ পাতে আসবে "কুনাফা", বা "Knafeh"। 

প্রথমেই আমরা সুন্দর এই পরিবেশের আনন্দ অনুভব করলাম, ও তারপর বললাম সূচক হিসেবে "চিকেন শূরবাঁ", যা অবশ্যই আরবীয় স্যুপ, আর "শিস তাউক", বা "চিকেন শীস কেবাব" আনা যাক। মৃদু  স্বাদের স্যুপ, ও নরম আঁচে সুপক্ব মাংসের কেবাব সত্যিই সুন্দর; সহজপাচ্য ও সুস্বাদু। ততক্ষণে অন্যান্য "দরবারে" মান্ডির আনাগোনা দেখে আমাদেরও কৌতূহল রসনা ও মস্তিষ্ক দুই-ই সচল করে তুলেছে! আমরা সবাই-ই যাকে বলে উদরপূর্তি শুধু নয়, মানসিক তৃপ্তিতে বিশ্বাসী, তা-ই যখন বিরাটকার কাংস্যনির্মিত থালায় সুসজ্জিত লাহাম মান্ডি এলো, সে এক দারুণ আনন্দের, মন ভালো করার মুহুর্ত! 

Arab Cuisine, Arbi Food, shish tauk, shish kebab, kolkata street food, food blogging, food bloggers, food blog, kolkata
শীস তাউক

Sorba, Chicken Shorba, Arbi Cuisine, Arab Cuisine, Kolkata Street Food, Food Blogger, Food Blog, Kolkata, Food Blogging
চিকেন সূর্বা

চারপাশে রন্ধিত মশলাদি দেওয়া চাল, অর্থাৎ এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, স্টার আনিস ইত্যাদি দিয়ে, এবং মধ্যমণি হয়ে বিরাজমান মাংস খণ্ড, এমন নরম তুলতুলে সুসিদ্ধ মাংস আমি কখনো খাইনি, যা এই পরিমাপের! মান্ডি রান্না করা হয় পিট কুকিং পদ্ধতিতে, যা বিভিন্ন দেশে, ও স্থান অনুযায়ী কিছুটা বদলায়, বদলায় উপকরণও। এখানে কিভাবে করা হয়েছে তা জানিনা, কিন্তু রান্নার প্রণালী ও প্রকার অতিক্রম করে মন ছুঁয়ে গেছে অবশ্যই, কারণ সাধারণত বিরিয়ানি খেয়ে যে ভারী অনুভূতি, সেটি এক্ষেত্রে হয়না। 

Mandi Biriyani, Laham Mandi Biriyani, Arabi Cuisine, Arbi Food, Kolkata Street Food, Food Blogger, Food Blog, Food Blogging
লাহাম মান্ডি বিরিয়ানি

এছাড়া, বন্ধুবান্ধবদের, প্রিয়জনের সঙ্গে একই থালায় ভাগ করে খাওয়ার মজা, আনন্দ, সে তো ভালো লাগারই কথা, সুযোগ হয়না, পরিস্থিতিও নেই, মনে পড়ে যাচ্ছিলো ছাত্রাবস্থায় হোস্টেলে খাওয়াদাওয়ার সময় হৈ-হুল্লোড়। 

যা-ই হোক, এটি খেয়ে মোটামুটি যা মনে হলো, চারজন নয়, এটা খাইয়েরা দুজনেই খেয়ে নিতে পারেন, বা তিনজন। তারপর, শেষ পাতে আরেকবার ঠাণ্ডা পানীয়, ও সেই ডেসার্ট পদ, বা মিষ্টি, কুনাফা। এই পদটিও মধ্যপ্রাচ্যের, কিছুটা গ্রীক বাকলাভার সঙ্গে মিল আছে, এবং এর অনেক সংস্করণ, রূপ আরব দুনিয়া থেকে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপেও খ্যাত, অর্থাৎ বালকান উপদ্বীপীয় অঞ্চলে। আমি মিষ্টি খুব একটা ভালোবাসি না, তবে ক্ষীরের মতো উপকরণ, উপরে ভাজা সেমাই ও শুকনো ফল, মোটের উপর মন্দ নয়। তবে, আজকের নায়ক লাহাম মান্ডি বেশ ভালো লাগলো, কারণ আগেই বলেছি, সুস্বাদু, ও সহজপাচ্য। 

Knafeh, Kunafa, Arabi Cuisine, Arbiu Food, Kolkata Street Food, Food Blogger, Fodd Blogging, Food Blog
কুনাফা

যা-ই হোক, খেয়েদেয়ে তো চুপচাপ বাড়ি ফেরার মানুষ আমার সঙ্গীরা নয়। আজকের সফরে প্রথমবার এসেছিলো চিরঞ্জয়ের স্ত্রী রিম্পা, ছোট্ট রিয়ান, ও আমাদের রায় বাবুর বন্ধু পিয়াল। পিয়ালের সঙ্গে আমাদের প্রথম আলাপ, অত্যন্ত সপ্রতিভ, মিষ্টভাষী, ও আলাপী, তার কাছে ঢাকার কাচ্চি নিয়েও কিছু আলাপচারিতা হলো। তারপর, চিরঞ্জয়রা আজকের মতো বিদায় নিলো, আমরা ছুটলাম একপাক প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে, গঙ্গার হাওয়ায় হজম ভালো হয় কিনা! সেখানে আরেকপ্রস্থ আড্ডা, গল্প, ও ছবির পালা। 

প্রতিটি দিনেরই শুরু ও শেষ হয় আরেকটি দিনের জন্য অপেক্ষায়, প্রত্যাশা ও পদক্ষেপের সন্ধিক্ষণে। আমাদের আজকের সফর ছিলো তেমনই একটি দিন, আগেরবারগুলোতে যারা ছিলো, তাদের বারবার মনে করে দুঃখ করছিলাম, আবার নতুনদের আসায় প্রাপ্তিও হলো। আগামীর জন্য আবার কিছু থাকবে, এই আশা নিয়ে আজকের মতো বিদায় নিলাম। 


রেস্তোরাঁর এই বিশেষ পদটি জানা গেলো হায়দরাবাদের একটি গ্রামের থেকেই সংগ্রহীত নিজস্ব মশলা ইত্যাদি থেকে তৈরি, তা সে যা-ই হোক, মন ভালো করে দিয়েছে সুন্দর সঙ্গ, আর সুন্দর যা, তা-ই তো সত্য। আমার আবার, সবার উপরে মন ভালো করাটাই সত্য, তার উপরে? নাই। 😊

Wednesday, March 30, 2022

মর্গ্যান হাউসের অভিজ্ঞতা

 

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Heritage Building
সকাল বেলায় মর্গ্যান হাউস

ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির কাছে ইদানিং কালিম্পংয়ের মর্গ্যান হাউস নামটা বেশ জনপ্রিয়। অবশ্য তার একটা অন্য কারণও আছে। ব্রিটিশ কলোনিয়াল আর্কিটেকচারের অনন্য নিদর্শন এই মর্গ্যান হাউসের আবার "ভুতুড়ে" বাড়ি হিসেবে "সুনাম" আছে! আজকাল গুগলে একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন মর্গ্যান হাউসে রাত কাটানো লোকজনের রোমহর্ষক সব অভিজ্ঞতার গল্প। তাই ভাবলাম একবার এখানে গিয়ে থাকলে মন্দ হয়না! ভূতের দেখা পাই না পাই অন্তত একটা হেরিটেজ প্রপার্টিতে থাকার অভিজ্ঞতা তো হবে। 

Morgan House, rear view, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blogger, Travel Blog, Heritage building
বাংলোর পিছন দিকে

১৯৩০ এর দশকের প্রথম দিকে পাট ব্যবসায়ী জর্জ মর্গ্যান কালিম্পংয়ের দুরপিন দারা পাহাড়ের ওপর এই বাংলোটি তৈরী করেন। প্রায় ১৬ একর জায়গা জুড়ে স্থাপিত এই বাংলো মূলত বাগানবাড়ি হিসেবেই ব্যবহৃত হত। মর্গ্যান দম্পতির মৃত্যুর পর বাড়িটি ট্রাস্টিদের হাতে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়ির দায়িত্ব নেয় ভারত সরকার। পরে ১৯৭৫ সাল নাগাদ WBTDCLকে মর্গ্যান হাউস হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে অট্টালিকাটি "বুটিক হোটেল" হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এই বাংলোয় থাকার অভিজ্ঞতাই আজ ভাগ করে নেবো সবার সাথে।

Morgan House, Kalimpong, WBTDCL, travel blogger, incredible India, heritage  building, travle blog
গেট থেকে মর্গ্যান হাউস

Night view, Morgan house, kalimpong, West Bengal, beautiful Bengal,  travel blogger, travel blog
রাতের মর্গ্যান হাউস

মূল কালিম্পং শহর থেকে প্রায় ৩ কিমি বাইরে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ায় অবস্থিত হওয়ায় মর্গ্যান হাউসের পরিবেশ খুব শান্ত। বাংলোর সামনে এবং পিছনে আছে সযত্নে তৈরী বাগান এবং পাইন গাছের সারি। সকালে বাংলোর লনে বসে দার্জিলিং টি খাবার মজাই আলাদা! এখন ফুলের সিজন শুরু হওয়ায় বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছই রঙিন! আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখাও মেলে এখান থেকে। তবে আমাদের মন্দ ভাগ্য! আকাশ পুরো মেঘলা থাকায় "তেনার" দর্শন মেলেনি। এছাড়াও উপভোগ করতে পারবেন রাস্তার উল্টোদিকে "গ্রীন গেল গল্ফ কোর্সের" অসাধারণ দৃশ্য। মর্গ্যান হাউসের ভিতরে ঢুকলে মনে হবে মধ্যযুগীয় কোন বাড়িতে প্রবেশ করেছেন। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ৫টি ঘর এবং নীচে ডাইনিং হলের পাশে একটি ঘর আছে। ঘরের মেঝে কাঠের তৈরী। এমনকি প্রতিটি ঘরে ফায়ার প্লেস করা আছে... যদিও কোনোটাই ব্যবহার হয় না বর্তমানে। এখানে সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। খাবার দাবার বেশ ভালো এবং দাম আয়ত্তের মধ্যেই। এখানকার কর্মচারীদের ব্যবহার প্রচণ্ড ভাল এবং ট্যুরিস্টদের সাহায্যের জন্য এঁরা সর্বদাই প্রস্তুত।

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Green Gale Golf Course, Kalimpong
গ্রীন গেল গল্ফ কোর্স

Morgan House, Travel Blogger, Beautiful Bengal, West Bengal, Travel Blog, Green Gale Golf Course, Kalimpong
গ্রীন গেল গল্ফ কোর্স

ভাবছেন এত কিছু বললাম আর "তেনাদের" কথা কিছু বলছি না কেন? আরে থাকলে তো বলবো! নেটে তো অনেককিছুই পড়েছিলাম। কেউ নাকি রাতে লেডি মর্গ্যান এর হিল তোলা জুতোর আওয়াজ পেয়েছেন! কাউকে নাকি সকালে বাগানের কোন গাছের তলায় পাওয়া গেছে! আবার কেউ কেউ তো এত ভয় পেয়েছেন যে বাইবেল নিয়ে শুতে হয়েছে! বিশ্বাস করুন কিছুই নেই। সব গাঁজাখুরি গপ্পো! এখানকার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম বেশিরভাগ "ভূত শিকারী", যাঁরা নাকি এখানে রাতের বেলায় ভূতের দেখা পেয়েছেন, তাঁরা আদৌ এখানে থাকেননি! হয়ত এইসব রটনা আটকাতেই বোর্ডার ছাড়া বাইরের ট্যুরিস্ট প্রবেশ নিষেধ।

দুজন মানুষের কথা না বলে এই লেখা শেষ করলে খুব অন্যায় হবে। প্রথমজন রাজ বসু স্যার। সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারতে পর্যটনের প্রচার এবং উন্নতির বিষয়ে এনার ভূমিকা অসামান্য! গত ২২শে মার্চ আমার কন্যার জন্মদিন ছিল। ঘটনাচক্রে সেদিন রাজ্য সরকারের তরফে মর্গ্যান হাউসে একটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম রাখা হয়েছিল। ট্রেনিং নেবেন স্বয়ং রাজ বসু স্যার। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমার এবং আমার স্ত্রীর কথোপকথনের সময় মেয়ের জন্মদিনের ব্যাপারটা ওনার কানে যায়। আমাদের সম্পূর্ন অবাক করে দিয়ে রাজ বসু স্যারের উদ্যোগে এবং মর্গ্যান হাউসের বাকি কর্মচারীদের সহায়তায় বার্থডে কেকের আয়োজন করা হয় এবং ছোট্ট একটি সেলিব্রেশন করা হয়! বেড়াতে গিয়ে এইরকম আতিথেয়তা সত্যি মন ছুঁয়ে গেল। দ্বিতীয়জন অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শুভঙ্কর বাবু। এই ভদ্রলোকের ব্যবহার অসাধারণ। সবসময় হাসি মুখে সাহায্য করতে পাশে পাবেন শুভঙ্কর বাবুকে। আসলে এনাদের মত মানুষদের জন্যই সম্পূর্ন অচেনা জায়গায় থাকার অভিজ্ঞতাও অসাধারণ হয়ে ওঠে! আবারও ফিরে যাবার ইচ্ছে জাগে মনে।

কন্যার জন্মদিন উদযাপন। একদম ডান দিকে রাজ বসু স্যার। একদম বাঁদিকে শুভঙ্কর বাবু।

মর্গ্যান হাউসের ঘরের বুকিং এবং ট্যারিফ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাবেন WBTDCL এর ওয়েবসাইটে। রুম বুকিং একমাত্র অনলাইনেই করা যায়। আসল মর্গ্যান হাউসে থাকার জন্য ওয়েবসাইটে "মর্গ্যান হাউস ট্যুরিজম প্রপার্টি" সিলেক্ট করে বুকিং করতে হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে মর্গ্যান সাহেবের বাংলোয় আপনারও থাকার সৌভাগ্য হয়ে যাবে।